গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা ওষুধ বিজ্ঞানী


ইসরাত জাহান ইভা প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ১১, ২০২২, ৫:৪৬ অপরাহ্ণ /
গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা ওষুধ বিজ্ঞানী

স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের একটি বিশেষ শাখা হলো ফার্মেসি। মূলত ফার্মেসি হলো একটি ওষুধ বিজ্ঞান। ফার্মেসি নিয়ে যারা পড়াশোনা করে তাদের বলা হয় ফার্মাসিস্ট। ফার্মাসিস্ট বলতে যারা ওষুধ তৈরি করে এবং কিভাবে তা সংরক্ষণ, ব্যবহার, ও সঠিকভাবে চিকিৎসাগত প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং সর্বদিকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তা যাচাই বাছাই করে অভিজ্ঞতা অর্জন করা কে বোঝানো হয়েছে।

সব থেকে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আধুনিক যুগে এসেও মানুষ বিশ্বাস করে ফার্মেসি নিয়ে পড়া মানে ওষুধের দোকান দেওয়া এবং ওষুধ বিক্রি করা। আমাদের দেশের কতিপয় লোক ছাড়া সত্যিকার অর্থে কেউ জানে না ফার্মাসিস্টদের কাজ কি। আমাদের দেশে তিন ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্ট আছে।

বিভিন্ন সরকারি- বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা ফার্মেসিতে চার বছরে ব্যাচেলর অফ ফার্মেসি ( বি-ফার্ম) অথবা পাঁচ বছরের ব্যাচেলর অফ ফার্মেসি প্রফেশনাল ( বি ফার্ম প্রফেশনাল) পাশ করেন তাদের এ -গ্রেড ফার্মাসিস্ট বলা হয়।

দেশের বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি হেলথ ইনস্টিটিউট বা মেডিকেল টেকনোলজি ইনস্টিটিউট থেকে যারা ফার্মেসিতে তিন বছর মেয়াদি ফার্মেসিতে ডিপ্লোমা পাশ করেন তাদের বি-গ্রেড ফার্মাসিস্ট বলা হয়।

ফার্মেসি কাউন্সিল অফ বাংলাদেশ ওষুধ দোকান মালিকদের সমিতি, কেমিস্ট এবং ড্রাগিস্ট অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যাল সোসাইটির সহায়তায় আরেক ধরনের ফার্মাসিস্টের কোর্স পরিচালনা করেন। এটির নাম ‘সার্টিফিকেট ইন ফার্মেসি’। ‘সহজ ওষুধ বিজ্ঞান’ নামে ফার্মেসি কাউন্সিল প্রকাশিত একটি বই পড়ানো হয় এই কোর্সে। ২-৩ মাস মেয়াদে এই কোর্স সম্পূর্ণ করে ফার্মেসি কাউন্সিল একটি পরীক্ষা নেওয়া হয়। এই পরীক্ষায় যারা পাস করেন তাদের সি- গ্রেড ফার্মাসিস্ট বলা হয়।

গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট বা স্নাতক ফার্মাসিস্টরা দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন শাখার যেমন ওষুধ উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ফর্মুলেশন), উৎপাদন পরিকল্পনা, বিপণন, ট্রেনিং, রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স ইত্যাদি শাখায় কাজ করে। এসকল গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা ওষুধ বিজ্ঞানী। ফার্মাসিস্টদের নিরলস গবেষণার ফলে একসময়ের ওষুধ আমদানি নির্ভর এই দেশ এখন ওষুধ রপ্তানি কারক দেশে পরিণত হয়েছে। ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রায় একশত পঞ্চাশটিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে ওষুধের মতো খুব সেনসিটিভ এবং হাইটেক একটি পণ্য।

একজন ফার্মাসিস্ট কে যে সব কাজে প্রয়োজনঃ

-ওষুধের গুণগতমান নিশ্চিতকরণ এবং পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা।
-গবেষণার মাধ্যমে উন্নতমানের ওষুধ প্রস্তুতকরণ।
-কত তাপমাত্রায় ঔষধ সংরক্ষণ করতে হবে তা জানার জন্য।
-ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে জানার জন্য ।
-ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া জানার জন্য দরকার।
-কোন ওষুধ কোন পরিবেশ (ক্লাস) বানানো হবে তা জানতে দরকার।
-ওষুধের ফার্মাকোলজি জানার জন্য।
-বয়স ভিত্তিক ওষুধের ডোজ নির্ধারণের জন্য।
-কোন কোন ওষুধ ব্যান্ড করা হয়েছে এবং কেন করা হয়েছে তা জানতে।
-কোনটি ভেজাল আর কোনটি আসল ঔষধ তা চিনতে।
-প্রতিটি মেডিসিন দেহের কোথায় কাজ করে বা কোন রোগের জন্য কাজ করে সেটা জানতে।

তাই মনে রাখতে হবে ফার্মাসিস্ট কোন ওষুধের দোকানদার বা সেলসম্যান নয়। শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসি বিষয়ে সম্মান ডিগ্রী লাভ করে যারা ফার্মেসি কাউন্সিল থেকে এ গ্রেড রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট অর্জন করে তারাই বাংলাদেশের এক একজন ফার্মাসিস্ট বা প্রথম শ্রেণীর ওষুধ গবেষক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

ফার্মাসিস্টদের সঠিক জায়গাগুলো যেমন ফার্মাসিউটিক্যালস, হসপিটাল, কমিউনিটি বেসড ক্লিনিক, সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। ফার্মাসিস্টদের উপযুক্ত গবেষণাগার তৈরি করে দিলে দেশের ঔষধ এবং চিকিৎসা দুটি পৃথিবীতে সমাদৃত হবে এবং দেশ লাভবান হবে। সবার আগে দেশ এবং দেশ সেবাতে ফার্মাসিস্ট একটা নিঃস্বার্থ সেবাদাতার নাম।

এই করোনা মহামারীতে ফার্মাসিস্টরা আমাদের স্বাস্থ্য সেবায় অনেক বড় অবদান রেখেছেন। যখন
করোনা মহামারী এ দেশে অবস্থান করে ফার্মাসিস্টরা নিজেদের ও পরিবারের কথা চিন্তা না করে শুধু দেশের মানুষের কথা ভেবে এ করোনা মহামারীকে প্রতিহত করার জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঐ সময় ছুটে গিয়েছেন ঔষধ ফ্যাক্টরিতে ওষুধ তৈরি করতে। যখন এই অদৃশ্য শক্তি একের পর এক দেশকে গ্রাস করে লাখ লাখ মানুষের জীবনের প্রদীপ নিভিয়ে দিচ্ছে তখন এদেশের ফার্মাসিস্টসহ অন্যান্যরা দ্রুত ভ্যাকসিন তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন এবং করে যাচ্ছেন। তাদের উদ্দেশ্য একটাই, যেন দেশের প্রতিটা প্রান্তের মানুষ এই মহামারি থেকে রক্ষা পায় এবং তারা যেন প্রয়োজনীয় ওষুধগুলো নিতে পারে।

পরিশেষে এটাই প্রমাণিত হয় ফার্মাসিস্ট ছাড়া কোনো ওষুধ তৈরি করা সম্ভব নয়। সুতরাং প্রতিটি ফার্মাসিস্টকে যদি তার যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করা হয় তাহলে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেশ ও জনগণের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে কাজ করতে পারবে।

লেখকঃ ইসরাত জাহান ইভা
শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।