ছোটগল্প : ঝড়-বৃষ্টির কবলে


সম্পাদক প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২, ২০২২, ৩:২১ পূর্বাহ্ণ /
ছোটগল্প : ঝড়-বৃষ্টির কবলে

মা বাবার সাথে শহরে থাকি।আমি আর আমার ছোটো ভাই যখন অনেক ছোটো ছিলাম তখন মা-বাবার সাথে শহরে চলে আসি।আমার বয়স যখন পাঁচ বছর এবং ছোট ভাইয়ের বয়স যখন মাত্র একবছর তখন বাবার চাকরির জন্য ঢাকা শহরে চলে আসি। তারপর থেকেই শহরে বড় হয়েছি। মা-বাবার ব্যস্ততার জন্য একবারও গ্রামে যাওয়া হয়নি।সে ঠিক ১২ বছর আগের কথা যখন আমরা গ্রাম থেকে চলে আসি।

হঠাৎ একদিন বাবা-মা আমাদের কাছে এসে বললেন, অনেক বছর হয়ে গেল গ্রামে যাওয়া হয়নি।এবার চলো সবাই মিলে গ্রাম থেকে ঘুরে আসি।এখন অফিসে  কাজের চাপও কম।বাবা আরো বললেন,গ্রামে যাওয়ার জন্য অফিস থেকে কিছুদিনের ছুটি নিয়েছি।আমি আর ছোট ভাই আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম।কি মজা! কি মজা!আমরা গ্রামে যাবো! আমি বাবাকে বললাম তাহলে গ্রামের উদ্দেশ্যে কালকে সকালেই রওনা দেব। বাবা বললেন ঠিক আছে তাই হবে।

এখন আষাঢ় মাস অর্থাৎ বর্ষাকাল। আকাশ থেকে হঠাৎ করে বৃষ্টি নেমে পড়ে।বৃষ্টি ভেজা পরিবেশ আমার খুব ভালো লাগে।যাইহোক জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখে পরদিন সকালে ভোরের ট্রেনে রওনা হলাম। আমার ছোট ভাইয়ের নাম হলো আরজু।ওর বয়স এখন তেরো বৎসর।ট্রেনে বসে গ্রাম এর উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় বাবাকে একটা প্রশ্ন করলাম আমাদের গ্রামের অবস্থা এখন কেমন।কিছু কি খোঁজ খবর নিয়েছো বাবা? বাবা বললেন,গ্রামটি এখনো অজপাড়াগাঁ হয়ে আছে।আমাদের গ্রামে এখনো তেমন উন্নতি হয়নি।গ্রামের বেশিরভাগ পরিবার এখনো বিদ্যুৎ পায়নি।তারা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে।তারা এখনো মোমবাতি, হারিকেন ব্যবহার করে।সকাল-সকাল রান্না করে খাওয়া দাওয়া শেষ করে সন্ধ্যার পর পরই সবাই ঘুমিয়ে পড়ে।

গ্রামের মাঝ দিয়ে একটা নদী বয়ে গেছে।নদীটির নাম কমলা।গ্রামের বাইরে কোথাও যাওয়া আসার জন্য একটিমাত্র পাকা রাস্তা আছে।সেই রাস্তাও অনেক পুরনো।অনেক জায়গায় ভেঙ্গে গেছে।এই পাকা রাস্তার মাঝেই এই নদীটি তাই এখানে মাঝারি ধরনের একটা পুরাতন ব্রিজ আছে।আর গ্রামের মধ্যে কিছু রাস্তা ইট বিছানো আর বাকিগুলো সব কাঁচা রাস্তা।আমাদের গ্রাম অনেক বড় কিন্তু আমাদের গ্রামের জনসংখ্যা খুবই কম।চারিদিকে ফাঁকা মাঠ।অনেক ফাঁকা ফাঁকা বাড়িঘর।চারিদিকে শুধু গাছপালা আর গাছপালা।একেবারে যেনো বনে ঢাকা নিঝুম পরিবেশ।গ্রামের খবরা-খবর শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম বুঝতে পারিনি।

সকাল ১১ টার দিকে গ্রামের কাছাকাছি একটা স্টেশনে নামলাম।বাবা ট্রেন থেকে নামার পর একটি ভ্যান ভাড়া করলো। তারপর জিনিসপত্র সব ভ্যান গাড়িতে তুলে রওনা দিলাম গ্রামের দিকে।পাকা রাস্তা দিয়ে ভালোভাবেই যাচ্ছিলাম।কিন্তু আধা পাকা রাস্তা অর্থাৎ ইট বিছানো পথে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে একেবারে লাফালাফি করতে করতে যেতে হলো।ইটের রাস্তা শেষে এবার মাটির কাঁচা রাস্তায় যেতে হবে।এজন্য ভ্যান থেকে নামলাম।ভ্যান থেকে নেমে মনে হল এতক্ষণে আমাদের যেনো  কাঠ-খোলায় খই ভাজা হলো।সারা শরীর ব্যথা করছে।আর একটু এগিয়ে গেলেই বাড়িতে পৌঁছে যাব। কিন্তু বৃষ্টির কারণে মাটির রাস্তা কাঁদা হয়ে আছে। তাই সবাইকে এইটুকু রাস্তা কাঁদার মধ্যে দিয়েই যেতে হলো।আমরা গ্রামে নিজেদের বাড়িতে পৌঁছে গেলাম।

তারপর পরিবারের সবাই আমাদের দেখে ঘর থেকে বাইরে চলে এলো।দাদা-দাদী বললেন,অনেক দূর থেকে এসেছো।তোমরা সবাই গিয়ে গোসল করে নাও।আমরা গোসল শেষ করে খাওয়ার জন্য গেলাম। তারপর পরিবারের সকলে মিলে একসাথে খেতে বসলাম। আমাদের এই যৌথ পরিবারে বর্তমানে দাদা-দাদী বাবা-মা,আমরা দুই ভাই, চাচা-চাচী ও তাদের এক সন্তান মিলে এই পরিবার। চাচাতো ভাইয়ের নাম হলো সুমন।ও প্রায় আমার সমবয়সী।খাওয়াদাওয়া শেষ করে আমি আরজু আর সুমন তিনজন একসাথে অনেকক্ষণ খেলাধুলা করলাম।ছোটো ভাই যখন বাবা-মার কাছে গেল তখন আমি সুমনকে বললাম, কালকে খাওয়া-দাওয়ার পর পুরো গ্রামটা আমাকে ঘুরে দেখাবি।সুমন বললো ঠিক আছে কালকে আমরা ঘুরতে বের হবো।ছোট ভাই আরজুকে এ কথা বলেছিলাম না।এখন আষাঢ় মাস যদি কোন রকম বিপদ হয়। রাস্তাঘাটে ঝড় বৃষ্টি নেমে আসে! তখন খুব ঝামেলা হবে।ওকে কোনো বিপদে ফেলতে চাইনি। ভাইকে যে খুব ভালোবাসি।তাই ওকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম না।

রাতে উঠানে বসে সবাই মিলে দাদুকে গল্প বলতে বললাম।প্রথম দিকে দাদু রাজি হচ্ছিল না।পরে তিন নাতির আবদারে দাদু গল্প বলার জন্য রাজি হয়ে গেল।আমাদেরকে দাদু বলল কি গল্প শুনবি বল।আমি কিছু বলার আগেই আরজু ও সুমন বললো দাদু ভূতের গল্প শুনবো। আমি ভূত বিশ্বাস করি না।ভূতের গল্প শুনতেও চাই না।কিন্তু আরজু ও সুমনের  জন্য আমাকে ভূতের গল্প শুনতে হলো।গল্প শেষে আমরা ঘুমানোর জন্য ঘরে গেলাম।ঘরের জানালা দুটো খোলা ছিলো।আরজু আমাকে বললো ভাই জানালা দুটো বন্ধ করে দে যদি কোনো ভয়ংকর কিছু মানে ভূত-প্রেত আসে। আমি হা হা হা করে হেসে বললাম তুই একটা ভীতুর ডিম।সে বলল পৃথিবীতে সত্যি ভূত আছে।তুই বিশ্বাস কর বা না কর কিন্তু আমি বিশ্বাস করি।তারপর আরজু নিজেই গিয়ে জানালা বন্ধ করে দিল।পরদিন সকালে সুমনকে ডাকতে লাগলাম গ্রাম ঘুরে বেড়ানোর জন্য।কিছুক্ষণ পর সুমন উঠোনে এল এবং সাথে আমার মা-বাবাও উঠানে এলো।

আমি বললাম,তোমরা আবার কিসের জন্য এসেছো?বাবা বলল,তোদের সাথে আরজুও যেতে চায়।ওকে নিয়ে যা।আমি প্রথমে নিতে চাইলাম না পরে ভেবে বললাম,ঠিক আছে।ওর গোমরা মুখ হাসিতে পরিণত হলো।সুমনকে বললাম,চল যাই রওনা দেই।কিন্তু সুমন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,তোরা দুই ভাই যা,গিয়ে গ্রামটি ভালোভাবে ঘুরে আয়।আমি অবাক হয়ে বললাম,তুই এসব কি বলছিস আমরা গ্রামের কিছুই চিনি না।আমরা কিভাবে যাব?আর তুই-ই বা কেন যাবি না?

একটু পর সুমনের মা অর্থাৎ আমার চাচি এসে বলল,ওকে একটু কাজের জন্য ওর মামার বাড়িতে পাঠাচ্ছি।ও আজকেই ফিরে আসবে।আমার ও আরজুর মন খারাপ হয়ে গেল এই কথা শুনে।তাহলে আমাদের আজ আর যাওয়া হবে না।সুমন একটু ভেবে বলল, কেনো যাওয়া হবে না?আজকে যখন যেতে চেয়েছিস আজকেই যাবি।আমি মামার বাড়িতে যাওয়ার সময় তোরা আমার সাথে যাবি আর গ্রামটি ঘুরে ঘুরে দেখবি। তারপর তোরা দুইজন গ্রামের মাঝে যে পুরাতন ব্রিজ টি আছে তার পাশে বসে থাকবি। আবার মামার বাড়ি থেকে আসার সময় তোদেরকে নিয়ে বাড়িতে চলে আসবো।তাহলেই তো হবে।আমি ও আরজু বললাম ঠিক আছে তাই হবে।সুমন বলল,তাহলে চল এবার রওনা দেই।আমরা একসাথে বেরিয়ে পড়লাম এবং চারিদিকের প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করতে লাগলাম।

গ্রামে বাড়ি ঘরের সংখ্যা একেবারেই কম।চারিদিকে শুধু গাছপালা জঙ্গল এবং মাঝে মাঝে কিছু কৃষি জমি আছে।যেগুলাতে এই গ্রামের কৃষকরা ফসল চাষ করে।সুমনের সাথে হেঁটে হেঁটে হাত পা ব্যাথা হয়ে গেল।ছোট ভাই বলল , ভাই অনেক তো বেড়ালাম চলো কোথাও গিয়ে একটু বসে বিশ্রাম করি।সুমন আমাদের দেখালো সেই ব্রিজটা।যেখানে আমাদের সুমন থাকতে বলেছিল। ব্রিজের পাশে গিয়ে একটু বসলাম।তারপর সুমন একটু এগিয়ে গিয়ে একটা ভ্যান গাড়িতে উঠে তার মামার বাড়ির দিকে রওনা হলো।আমি আর ছোট ভাই আরজু বসে থাকলাম । আমাদের বাড়ির কাছে থেকে আমরা ইচ্ছা করলে ভ্যানে উঠে ব্রিজ পর্যন্ত আসতে পারতাম।কিন্তু এই রাস্তা অনেক জায়গায় ভেঙ্গে ভেঙ্গে গেছে।ভ্যানে উঠে এলে কাঠ খোলায় খই ভাজা হতে হতো আমাদের।হাত পা আরো বেশি ব্যাথা হতো।তাই হেঁটে হেঁটে এসেছি।

সুমন মামার বাড়ি যাওয়ার আগে আমাদের কিছু কথা বলে গিয়েছিল।সুমন বলেছিলো,তোরা দুইজন কিন্তু এখানেই থাকবি।কোথাও যাবি না।এই আশেপাশে ঘুরাঘুরি করবি।আরো বলেছিলো,সাবধান ! এখানে দেখতেই তো পাচ্ছিস চারিদিকে কত জঙ্গল আর গাছপালা, কোনো বাড়িঘর নেই । শুনেছি সন্ধ্যার পর এখানে কেউ ঘুরাঘুরি করে না।অনেকের কাছে শুনেছি,এখানে নাকি ভূত-পেত্নী আছে।এখানে রাত ১২ টার পর অনেকেই নাকি এখান থেকে হারিয়ে গেছে।তারা কোথায় যে হারিয়ে গিয়েছে কেউ  জানে না।আমি হেসে বলেছিলাম,আমি এসব বিশ্বাস করি না আর সুমন তুই যে এত বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলিস কি আর বলব তোকে।সুমন বলেছিলো,আমি সত্যি কথাই বলছি।বাড়িতে গিয়ে দাদুকে একথা জিজ্ঞেস করিস দেখিস উত্তর পেয়ে যাবি।এই বলে সে চলে গিয়েছিলো।ও যাওয়ার পর আমরা আশেপাশে ঘুরতে লাগলাম।অনেক দূরে একটা ছোট্ট মাটির তৈরি ঘর দেখতে পেলাম।ঘরটি অনেক পুরাতন।ঘরটির বিভিন্ন জায়গায় ফাটলও ধরেছে।ঘরটির পেছনে একটা পুরাতন বটগাছ আছে।ঘরটির দেওয়ালে,মেঝেতে অনেক ছোটো ছোটো উদ্ভিদ জন্মে আছে।মনে হয় এখানে অনেক বছর কেউ থাকেনা।এই বাড়ি ছাড়া আশেপাশে আর কোথাও কোনো বাড়ি দেখতে পেলাম না।আমি আর আরজু আবার ফিরে এসে বসে রইলাম ব্রিজের পাশে।আকাশ এখন পরিস্কার।আকাশে মেঘের কোনো আনাগোনা নেই।দুই ভাই গল্প করতে লাগলাম।গল্প করতে করতে সূর্যটা দেখতে দেখতে দিগন্তের আড়ালে চলে গেলো।এবার খুব তারাতাড়ি অন্ধকার নামবে।এখনো এলোনা সুমন রাত হয়ে যাচ্ছে।আমি আর আরজু রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম আর মনে মনে চিন্তা করতে লাগলাম কখন যে সুমন আসবে।তারাতাড়ি বাড়ি ফেরা উচিত।পেটে ক্ষুধাও লেগেছে।এদিকে আমাদের কাছে তো একটা টর্চ লাইটও নাই।রাত হয়ে গেলো,বাড়িতে কিভাবে যাবো এসব চিন্তা করতে লাগলাম।সুমনের কোনো দেখাই নেই এপর্যন্ত।ছোটো ভাই বললো চলো আমরা দু’জন বাড়িতে ফিরে যাই।কিন্তু চারিদিকে অন্ধকার নেমে গেছে,টর্চ লাইট ছাড়া এখন বাড়ি যাওয়া প্রায় অসম্ভব।এখন সুমনকে ছাড়া আর বাড়িতেও যেতে পারবোনা।চারিদিকে জনশূন্য একটি মানুষও নেই।দুই ভাই ব্রিজটার সাথে হেলান দিয়ে বসে রইলাম।

আমাদের কাছে তেমন কিছু না থাকলেও দুই ভাইয়ের কাছে দুইটা ঘড়ি আছে।ঘড়িতে এখন রাত ৮ টা বেজে পঁচিশ মিনিট।এখনো সুমনের দেখা নেই।সুমনের উপর আমার খুব রাগ হলো।মনে হলো ও আসলে দুই ভাই মিলে ওরে খুব পেটাবো।আকাশের দিকে তাকালাম।এখনো তেমন মেঘের আনাগোনা নেই।সুমন এখনো এলোনা।এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম বুঝতেই পারিনি।রাতের মতো রাত হতে লাগলো।আমরা দু’জন অঘোরে ঘুমিয়ে আছি।

হঠাৎ আমাদের শরীরে বৃষ্টির পানির ছোটো ছোটো ফোঁটা পড়তে লাগলো।সাথে সাথে জেগে উঠলাম।ছোটো ভাই এখনো ঘুমিয়ে আছে।তাকেও খুব কষ্টে  জাগিয়ে তুললাম।আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ঘন কালো মেঘ উঠে আসছে।বৃষ্টি অনেক বেড়ে গেলো।আমরা গিয়ে বটগাছের নিচে দাঁড়ালাম।আষাঢ় মাসে বৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক কিন্তু হঠাৎ এতো বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো।দেখতে দেখতে পূর্ব দিক থেকে কালো মেঘে ঝড় উঠে এলো।বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থেকে সেই  ঝড়ের বর্ণনা দেওয়ার ক্ষমতা আমার নাই।ব্রিজের নিচে নদীতে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর করে ডেকে চলেছে শত শত ব্যাঙ।একটু পরপর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে আর সাদা আলোতে ভরে যাচ্ছে চারিদিক।ঝড় এবং বৃষ্টির মধ্যে কোনোমতে দু’ভাই একে অপরকে জড়িয়ে বসে রইলাম।গুড়ুম গুড়ুম শব্দে বাজ পড়ছে।আমি ও ছোট ভাই বাঁচার আশা ছেড়ে দিলাম.এই নির্জন জায়গায় একা একা দুইজন মানুষের এমন ঝড় বৃষ্টির কবলে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব।শুধু ভাবছি মৃত্যুটা কিভাবে হবে।ছোটো ভাই থরথর করে কাঁপছে। ওরে বললাম তোরে এইজন্যই আমি নিয়ে আসতে চাইনি।সে বললো,আমি না থাকলে তুমি একা এভাবে বিপদে পড়ে থাকতে।তখন কি হতো।আমি বললাম যা হবার হতো।আরজু বললো,মৃত্যু হলে হোক,দু’জন একসাথেই মরবো।আমি বললাম সাবাশ ভাই!খুব সুন্দর কথা বলেছিস।আবার হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকালো চারিদিকে কেউ নেই।

হঠাৎ একজন সাদা পোশাক পরিহিত ব্যক্তিকে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখলাম।দেখতে মানুষদের মতোই কিন্তু চোখ দুটো লাল।তিনি হেঁটে আসছে মনে হচ্ছে তার পা মাটিতে পড়ছেই না।ছোট ভাই তাকে দেখে একেবারে গা ঘেঁষে দাড়িয়ে রইল। মনে হয় ভয় পেয়েছে।আর ভয় পাবেই না বা কেন।আমি নিজেই ভয় পাচ্ছি আর ওর তো ভয় পাওয়ারই কথা।ভদ্রলোকটি আমাদের থেকে ঠিক ৫ গজ দূরে থেকে বললেন,এই ঝড়-বৃষ্টির রাতে এখানে কি করছো তোমরা?তোমরা তো ভিজে চুপসে গেছো।তিনি স্বাভাবিকভাবে বললেন,আমার বাড়ি এই পাশে তোমরা আমার সঙ্গে এসো।আমি অবাক হয়ে গেলাম এখানে তো কোনো ঘরবাড়ি নেই। আর তিনি এই ঝড়-বৃষ্টির রাতে একা একা এখানে কি করতেই বা এসেছে। ঝড়-বৃষ্টি যেনো আরও বেড়ে যেতে লাগলো।

আমরা আর কিছু না ভেবে তার পিছু পিছু যেতে লাগলাম।আমরা আবার লক্ষ করলাম তার পা দুটো যেনো মাটিকে স্পর্শ করছেই না।এত বাতাসে তার জামাকাপড় একটুও নড়ছে না।ভদ্রলোকটি আমাদের থেকে কয়েক হাত দূরে আছে।আমরা যত দ্রুত যাই ভদ্রলোকটিও তত দ্রুতই যায়।আমাদের থেকে সব সময় কয়েক হাত দূরে থাকেন।ভদ্রলোকটির জামাকাপড় এমন ফিটফাট আছে কিভাবে বুঝতে পারলাম না।দেখতে দেখতে তিনি সেই পুরনো মাটির বাড়ির সামনে এসে দাড়ালেন।যে মাটির ঘরটি সুমন চলে যাওয়ার পর আমরা দুইভাই দেখেছিলাম।তখন ঘরটি দেখে মনে হয়েছিলো অনেক যুগ ধরে এখানে মনে হয় কেউ থাকেনা।

ঘরটির অনেক জায়গায় ফাটলও ধরেছিল।গাছ – লতাপাতায় জন্মে ঘরটি ভরে গিয়েছিল।কিন্তু অবাক দৃশ্য হলো এখন ঘরটি নতুন চকচক করছে।কোনো ফাটল নেই।গাছ লতা -পাতার কোনো চিহ্ন নেই।একেবারে মনে হচ্ছে নতুন মাটির ঘর।কিন্তু এই কয়েক ঘন্টার মধ্যে ঘরটি নতুন হলো কিভাবে?আমি আর ছোট ভাই খুব ভয় পেলাম।ভদ্রলোকটি আমাদের ঘরে নিয়ে গেলেন।আমরা ঘরে গিয়ে আরো অবাক হয়ে গেলাম।ঘরে শুধু একটা বিছানা ছাড়া আর কিছুই নেই।বিছানা টাও নতুন চকচক করছে।ভদ্রলোকটি তাহলে থাকে কিভাবে?খায় কি? আর পোশাকই বা পায় কোথায়?ভদ্রলোকটি তার স্ত্রীকে ডাকলেন।হঠাৎ তার স্ত্রী এসে হাজির হলো এবং তাদের একটা ছেলেও এসে হাজির হলো।এতো দেখছি আলাদীনের প্রদীপ এর মতো।তার স্ত্রী এবং ছেলেটিরও চোখ লাল টগবগে।তারাও সাদা পোশাক পরিধান করে আছে।

আমি ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করলাম,আচ্ছা আপনারা কারা বলুন তো?হঠাৎ ভদ্রলোক,তার স্ত্রী এবং সেই ছেলেটি ৩ জনই খুব ভয়ঙ্কর ভাবে হেসে উঠলেন এবং তাদের আসল রূপ ধারণ করলেন।তাদের শরীরে শুধু কঙ্কালের হাড়গোড় ছাড়া আর কিছুই নেই।তারা মাটি থেকে অনেক উপরে ভেসে বেড়াতে লাগলো।এসব দেখে আমরা ভীষণ ভয় পেলাম।ভদ্রলোকটি বললেন, তোমাদেরকে আর যেতে দেব না।অনেক বছর আগে আমাদেরকেও এভাবে এনে আমাদের রক্ত,মাংস খেয়ে শুধু হাড় বানিয়ে রেখেছিল।আমাদের মতোই কিছু ভূত আমাদের এই অবস্থা করেছিল।তিনি বললেন, তোদেরকে এখন আমাদের দলে যোগ দিতে হবে। অনেকদিন ধরে আমরা মানুষের তাজা রক্ত মাংস পান করি না এবং খেতেও পাইনা।তাঁর স্ত্রী ও ছেলেটিরও ভয়ংকর কন্ঠস্বর ভেসে আসতে লাগল, রক্ত চাই রক্ত,রক্ত চাই রক্ত।এ যেন পিপাসায় কাতর  কোনো মানুষের জল চাই জল এরকম একটা অবস্থা।আমরা দুইজন বুঝতে পারছিলাম আমাদের মৃত্যুর হাত থেকে বাচাঁ এখন অসম্ভব।জীবিত,মৃত সকল বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজন এর কথা ভাবছিলাম।স্মরণ করছিলাম আমার মা-বাবাকে।

আর দেরি নয় “এসো এসো” বলে তারা চেঁচিয়ে উঠল।আমি আর ছোট ভাই ঘেমে জল হয়ে যাচ্ছিলাম।শুধু তাদের খিল খিল হাসির শব্দ বেজে চলছিলো।আমরা সৃষ্টিকর্তার নাম নিতে চাইলাম কিন্তু পারছিলাম না।মুখ দিয়ে যেন আর কথা বের হচ্ছে না। আমরা বাচার আশা ছেড়ে দিয়ে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হলাম।কিন্তু কয়েক ঘন্টা পার হয়ে গেল তারা আমাদের গা ঘেঁসে আসতে পারছিল না।শুধু বলছিলো তোমাদের হাতের ঘড়ি দুইটা ফেলে দাও, ফেলে দাও।আমি একটু চিন্তা করতে লাগলাম যে ব্যাপারটা কি।এরমধ্যে ছোট ভাই বলে উঠলো,ভাই ভূতেরা লোহার কাছে আসতে ভয় পায়।

আমাদের দুই ভাইয়ের হাতেই লোহার ঘড়ি রয়েছে।এজন্যেই তারা এখন পর্যন্ত আমাদের কিছু করতে পারে নাই।মনে একটু সাহস পেলাম।ছোটোভাই ভূতেদের বলল,আয় ভূতেরা তোদের কত সাহস আয় দেখি।আমি ছোটো ভাইয়ের কথায় আরো বেশি সাহস পেলাম।আমি ছোট ভাইয়ের হাত ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম এবং প্রচন্ড জোরে দৌড় দিলাম।এখন বৃষ্টি ও থেমে গেছে।আকাশে তেমন মেঘের আনাগোনা নেই।ঘড়িতে সময় দেখলাম।ফজরের আযান আর কয়েক মিনিটের মধ্যে দেবে।আমরা খুব জোরে দৌড়ে যাচ্ছি।দৌড়ানোর কোনো শেষ নেই। হঠাৎ অনেক দূরে থেকে এক মসজিদে ফজরের আযান দিতে আরম্ভ করল।আমরা মসজিদের কাছাকাছি চলে গেলাম।আমরা দুই ভাই বিপদ থেকে মুক্ত হলাম।

লেখক : শিক্ষার্থী, সপ্তম শ্রেণী, ডি.কে. উচ্চ বিদ্যালয়, বড়াইগ্রাম, নাটোর।