মরিয়মের কাজের দায়ভার কার?


Nazmus Sakib প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২২, ৮:৪৮ পূর্বাহ্ণ /
মরিয়মের কাজের দায়ভার কার?

আমাদের সুন্দর বাংলাদেশে মাঝে মাঝেই বিভিন্ন নিউজের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়াতে উচ্চ ট্রেন্ড দেখা যায়। যার কতক সত্য আর কতক মিথ্যা। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানের একটা আলোচিত ঘটনা হচ্ছে, ‘খুলনার মধ্যবয়স্ক গৃহবধু রহিমার অপরহরণ’ এর ঘটনা। সোশ্যাল মিডিয়াতে ফ্যান ফলোয়ার অর্জন আর জমিজমা উদ্ধারের জন্য মানুষ যে এতো নিচে নামতে পারে সেটা হয়তো এর আগে বিশ্ববাসি জানত না। দীর্ঘ একটা মাস দেশের মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করা এরপর দেশ বিদেশের সাংবাদিকদের নিজের দিকে ব্যস্ত রেখে এতো বড় নাটক যা অনেক বড় থ্রিলার উপন্যাস কে হার মানাবে। এহেন কাজের জন্য কি মরিয়ম মান্নান ও তার পরিবারকে কোন শাস্তির আওতায় আনা যাবে না?


প্রথমে আমরা যদি ঘটনার পেক্ষাপট জানার চেষ্টা করি তবে যা দেখতে পাব তা হচ্ছে, আজ হতে ২৭ দিন আগে খুলনা জেলার দৌলতপুর হতে কথিত অপহৃত হন রহিমা বেগম। ঘটনার সূত্রে রহিমার বেগমের মেয়ে মরিয়ম মান্না জানান, রাত আনুমানিক দশটার দিকে রাতের খাবারের পানি আনতে বাসার নিচে আসেন রহিমা বেগম এরপর আর তিনি আর ফিরেন নাই। দীর্ঘ এক ঘন্টা পরেও যখন তিনি ফিরে আসেন না তখন তারা নিচে গিয়ে দেখেন পানির বোতল ও মা এর ওরনা পড়ে আছে কিন্তু মা নেই। এরপর শুরু হয় নানান নাটকীয়তা। সাহিত্য পূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে ফেসবুকে একেরপর এক পোস্ট করতে থাকেন। যতগুলো টিভি চ্যানেল বা সংবাদ পত্রিকা তাকে ও তার মাকে নিয়ে নিউজ কভার করেছেন তার অধিকাংশ তিনি নিজ ফেসবুক আইডিতে শেয়ার করেছেন। তখন আমার মনে একটা সন্দেহ উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল কিন্তু তখন লিখলে দেশবাসি আমাকে তুলোধোনা করে ছাড়তেন। এই কারণে মহান আল্লাহ তায়ালার ফয়সালার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। অবশেষে মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে উত্তর চলে এসেছে। সে যাহোক এতো নাটক সাজানোর পরেও কীভাবে একজন অপরিচিত মহিলার লাশ নিয়ে এসে নিজের মা বলে দাফন করে দিতে একটি বার তার বিবেক বাধাদিলো না? গত ২২ তারিখ ১২টা ৪ মিনিটে আরেক ফেসবুক পোস্টে মরিয়ম মান্নান লিখেছেন, ‘আমি আমার মাকে পেয়ে গেছি। আর কারও কাছে যাবো না। কাউকে আর বলবো না আমার মা কোথায়। কাউকে বলবো না আমাকে একটু সহযোগিতা করুন। কাউকে বলবো না আমার মাকে একটু খুঁজে দেবেন। কাউকে আর বিরক্ত করবো না। আমি আমার মাকে পেয়ে গেছি।”  এরপর তিনি ময়মনসিংহের ফুলপুর হতে সেই অজ্ঞাত নামা লাশ কে নিজের মা এর বলে দেশবাসিকে আবেগে আপ্লূত করেন। দেশের আইন প্রশাসন কে ধিক্কার জানিয়ে বিভিন্ন পোস্ট দিতে থাকেন কিন্তু অবশেষে মরিয়মের মাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। সেই সাথে রহিমা বেগম স্বেচ্ছা আত্মগোপন এর বিষয়টা স্বীকার করেন।


একটা মিথ্যা গঠনা নিয়ে দীর্ঘ ২৭ দিন দেশবাসির ঘুম কে হারাম করে দেওয়া, দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এই মরিম মান্নানের কি কোন শাস্তি হবে না। আমাদের দেশে মাঝে মাঝে এমন মিথ্যা নিউজ বা গুজব দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু যিনি গুজব ছড়িয়ে থাকেন তাকে তেমন কোন শাস্তি দেওয়া হয় না যার ফলে এই গুজবের মাত্রা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। দুনিয়াবাসীর আকর্ষণ কেড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যুবক থেকে বৃদ্ধ, সবার অবসর সময় কাটানোর সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে এটি। এখন যেকোনো তথ্য মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে হয়ে উঠেছে এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। তাই দুষ্কৃতকারীরাও এই মাধ্যমকে গুজব ছড়ানোর হাতিয়ারে পরিণত করেছে। যেহেতু বর্তমান যুগের বেশির ভাগ মানুষের এখানে বিচরণ, তাই মানুষকে বিভ্রান্ত করতে তারা এই প্ল্যাটফর্মটাকে বেছে নিয়েছে। ব্যক্তিগত আক্রোশ ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব পুঁজি করেই এ ধরনের কাজ বেশি করা হয়। যেমন মরিমম মান্নানের বিষয়টা আমরা দেখতা পেলাম। নিজেদের আদর্শের বাইরে হলেই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ছড়ানো, ফটোশপে কারসাজির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিত্বকে অপমান করার চেষ্টা করাই এখন যেন এক শ্রেণির মানুষের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। অথচ এর পরিণাম যে কত ভয়াবহ, তা তাদের কল্পনায়ও আসে না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আর যে ব্যক্তি কোনো অপরাধ বা পাপ অর্জন করে, অতঃপর কোনো নির্দোষ ব্যক্তির ওপর তা আরোপ করে, তাহলে সে তো মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য গুনাহের বোঝা বহন করল। ’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১১২) মিথ্যা বলা বা গুজব ছড়ানো মুনাফিকের আলামত। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘মুনাফিকের আলামত তিনটি : ১. যখন সে মিথ্যা কথা বলে, ২. ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, ৩. আর যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, সে খেয়ানত করে। ’ (বুখারি, হাদিস : ৩৩) কোনো খবর দেখলেই যাচাই-বাছাই করা ছাড়া তা বিশ্বাস করা অনুচিত। পবিত্র কোরআনে ভুল তথ্য অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ, অন্তর, এগুলোর প্রতিটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে। ’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩৬) তাই কোনো চটকদার খবর চোখে পড়লেই যাচাই-বাছাই ছাড়া তা নিয়ে মাতামাতি করা উচিত নয়। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘সব শোনা কথা (যাচাই-বাছাই করা ছাড়া) বলা কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯২) আবার গুজব ছড়ানোর কারণে এতে বিভ্রান্ত হয়ে যদি সমাজে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে, কোনো গুনাহের প্রচলন হয়ে যায়, এর দায়ভারও যিনি গুজব ছড়িয়েছেন তার ওপর এসে বর্তাবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সৎপথের দিকে ডাকবে সে তার অনুসারীর সমান সওয়াব পাবে, অথচ অনুসরণকারীর সওয়াব কমানো হবে না। অপরদিকে যে ব্যক্তি ভ্রষ্টতার দিকে ডাকবে সে তার অনুসারীর সমান পাপে জর্জরিত হবে, তার অনুসারীর পাপ মোটেও কমানো হবে না। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৬০৯)


একজন মুসলিম হিসাবে ইসলামের দৃষ্টিতে গুজব ছড়ানোর শাস্তি সম্পর্কে অবগত হলাম এখন আমরা গুজব ছড়ানোর আমাদের দেশের আইনে কী শাস্তি আছে সে বিষয়ে জানার চেষ্টা করব। কারোর যদি গুজব ছড়ানোর বিষয়টা প্রমাণিত হয় তখন তাকে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩)-এর ৫৭ (দুই) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে অপরাধ করলে তিনি শাস্তি সবোর্চ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড এবং সবির্নম্ন ৭ বছর কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পযর্ন্ত অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। দেশের মানুষকে পেরেশান ও সোশ্যাল মিডিয়াতে গুজব ছড়ানোর অপরাধে মরিয়ম মান্নানের উপর আইসিটি আইন প্রয়োগের জন্য মহামান্য আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।


পরিশেষে বলব, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নানান ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে। আমাদের জীবনে প্রত্যেহ ছোট বড় অনেক সমস্যা আসবে। প্রত্যেক সমস্যার যৌক্তিক সমাধান আছে। কিন্তু সামান্য জমিজমা সংক্রান্ত প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার জন্য এইভাবে আত্মগোপন করে দেশবাসির আবেগ নিয়ে খেলা করার অধিকার কেউ তাকে দেয় নাই। আর এখন একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে এরপর যদি আমাদের দেশে এমন ঘটনা ঘটে তখন কি দেশের মানুষ এ কথা বিশ্বাস করবে? কাজেই আমাদের ব্যক্তি জীবনে নৈতিক শিক্ষার অভাব রয়েছে। তাই এসকল সমস্যা সমাধানে আমাদের নৈতিক শিক্ষা অর্জন করতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে আর কোন মরিয়ম জন্ম না হয় এজন্য এই মরিয়মকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এরকম দু’চারজন গুজব ছড়ানো ডিজিটাল অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনা গেলে আমরা গুজবের সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারব। তাই এই বিষয়ে আইনবিদদের সজাগ দৃষ্টি কামনা করছি।

লেখক: কবি ও কলামিস্ট

snazmussakib01@outlook.com