পটুয়াখালীর বাউফলে প্রায় ৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৬ সেতুর মূল কাঠামোর কাজ শেষ হলেও অ্যাপ্রোচ সড়ক, ইটের সোলিং ও রঙের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ফলে এসব সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয়রা।
ছয়টি সেতুর মধ্যে একটির উইং দেয়াল ধসে পড়েছে। কোথাও অ্যাপ্রোচ সড়কে মাটি ভরাট হয়নি, আবার কোথাও ইটের সলিং ও রঙের কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে। এর মধ্যে একটি সেতুর কাজ নির্ধারিত সময়ের ১ বছর ৯ মাস পরও শেষ হয়নি।
জানা গেছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ কর্মসূচির আওতায় এসব সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর প্রাক্কলিত ব্যয় অনুযায়ী ছয়টি সেতু নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৫৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪২ টাকা।
এর মধ্যে সূর্যমণি ইউনিয়নের নুরাইনপুর-রামনগর এলাকার রাজায় বিশ্বাস বাড়ির কাছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন নুরাইনপুর খালের ওপর ১ কোটি ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ১৭৯ টাকা ব্যয়ে ১৫ মিটার দৈর্ঘ্যের গার্ডার সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। সেতুটির নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় মেসার্স রুকাইয়া ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটিকে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের পর এক বছর ৯ মাস অতিবাহিত হয়ে গেছে। এরপরও সেতুটির পুরো কাজ শেষ হয়নি।
গত ৬ জুলাই সেতুটির পশ্চিম প্রান্তের উত্তর পাশের একটি উইংওয়াল ধসে পড়ে। পূর্ব দিকের দক্ষিণ পাশের একটি উইংওয়ালেও ফাটল দেখা দিয়েছে। উইং দেয়াল ধসে পড়ার পর দুই মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও সেটি এখনো সংস্কার করা হয়নি। পাশাপাশি অ্যাপ্রোচ সড়কে যথাযথভাবে মাটি ভরাট না করায় সংযোগস্থলে কাদামাটি জমে রয়েছে। ফলে মূল সেতু নির্মাণ করা হলেও স্বাভাবিকভাবে যানবাহন চলাচল করতে পারছে না।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. বাদল বলেন, সেতুর উইং দেয়াল ধসে পড়া এবং অ্যাপ্রোচ সড়ক অসম্পূর্ণ থাকায় এলাকার মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। কাদামাটির ওপর কাঠের তক্তা ফেলে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। সেতুর পশ্চিম পাশে একটি বড় বাড়ি রয়েছে। ওই বাড়িতে ভারি মালপত্র নিতে হলে গাড়ি নিয়ে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার পথ ঘুরে যেতে হয়।
মেসার্স রুকাইয়া ট্রেডার্সের মালিক মেহেদী হাসানের কাছ থেকে কাজটি কিনে বাস্তবায়ন করছেন একই এলাকার রফিকুল ইসলাম মেম্বার। তিনি বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছ থেকে কাজটি কিনে করছেন। সেতুর কাজে যেসব ত্রুটি রয়েছে, সেগুলো ঠিক করে দেবেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতুটির নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। সেতুর নিচে যথাযথভাবে সেন্টারিং না করায় বিম নিচের দিকে ঝুলে গেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, নির্মাণকাজের ত্রুটির কারণেই উইং দেয়াল ধসে পড়েছে।
এদিকে কনকদিয়া ইউনিয়নের ঝিলনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উত্তর-পূর্ব পাশে এবং সেকান্দার গাজীর খালের ওপর পৃথক দুটি ১১ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতু নির্মাণে প্রতিটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ লাখ ৬৩ হাজার ৯১৯ টাকা। মেসার্স আরবী আলিফ ট্রেডার্স কাজ দুটি বাস্তবায়ন করছে। একই ঠিকাদারের অধীনে কনকদিয়া সামসু মাস্টার বাড়ির আয়লা খালের ওপর ৮ মিটার দৈর্ঘ্যের আরেকটি সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে।
সেতুগুলোর অ্যাপ্রোচ সড়কে মাটি ভরাট, ইটের সোলিং ও রঙের কাজ এখনো শেষ হয়নি। চলতি বছরের ৩০ মার্চের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে। ফলে মূল সেতু নির্মাণ হলেও পুরোপুরি ব্যবহার উপযোগী হয়নি।
ঠিকাদার মো. ফারুক হোসেন বলেন, টাকার সমস্যার কারণে সেতুর উইংওয়াল, অ্যাপ্রোচ সড়কে মাটি ভরাট, ইটের সোলিং ও রঙের কাজ করতে পারেননি। তবে খুব শিগগির বাকি কাজ শুরু করবেন।
বগা ইউনিয়নের রাজনগর ১৭১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন পূর্ব ঝিলনা খালের ওপর ১১ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতু এবং মদনপুরা ইউনিয়নের আলুতলা খালের ওপর ৯ দশমিক ৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতু নির্মাণ করছে মেসার্স মা-বাবা দোয়া ট্রেডিং। পূর্ব ঝিলনা খালের সেতুটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৪১ লাখ ৬৩ হাজার ৯১৯ টাকা এবং আলুতলা খালের সেতুটির ব্যয় ৩৫ লাখ ৬১ হাজার ৩৭০ টাকা।
সেতু দুটির মূল কাঠামোর কাজ শেষ হলেও উইংওয়াল, অ্যাপ্রোচ সড়কে মাটি ভরাট, ইটের সোলিং ও রঙের কাজ অসমাপ্ত রয়েছে। গত ৩ এপ্রিলের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে।
ঠিকাদার মো. জুয়েল বলেন, অ্যাপ্রোচ সড়কের কিছু মাটির কাজ করা হয়েছে। বর্ষার কারণে পুরো কাজ শেষ করা যায়নি। ইটের সলিং ও রঙের কাজও শিগগির শেষ করবেন।
একই ঠিকাদারের অধীনে কালিশুরী ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের ১২০ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন খালের ওপর ৯ দশমিক ৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের আরেকটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। সেতুটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৩৫ লাখ ৬১ হাজার ৩১৭ টাকা। গত ৩ এপ্রিলের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও এখনো অ্যাপ্রোচ সড়ক, ইটের সলিং ও রঙের কাজ বাকি রয়েছে।
এ বিষয়ে ঠিকাদার মো. জুয়েল বলেন, মাটি পাওয়া না যাওয়ায় কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। দ্রুত বাকি কাজ শেষ করা হবে।
সেতুগুলোর কাছে কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সেখানে সেতুর নির্মাণকাজ অসমাপ্ত থাকায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
বিশেষ করে বগা ইউনিয়নের রাজনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় স্থানীয়দের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।
বগা ইউনিয়নের বাসিন্দা ওমর ফারুক বলেন, রাজনগর ১৭১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় স্থানীয়রা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। বিশেষ করে বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশুদের যাতায়াতে কষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজ চলাকালে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি দেখা যায়নি। ফলে কাজের মান ও অগ্রগতি নিয়ে তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব সেতুর নির্মাণকাজের বিপরীতে প্রায় ৯৫ শতাংশ বিল পরিশোধ করা হয়েছে। অথচ কয়েকটি সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক, উইং দেয়াল, ইটের সোলিং ও রঙের কাজ এখনো অসমাপ্ত। কাজের বাস্তব অগ্রগতি ও বিল পরিশোধের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কয়েকটি সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়কে মাটি ভরাট, ইটের সোলিং ও রঙের কাজ এখনো শেষ হয়নি। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নুরাইনপুর-রামনগর এলাকার সেতুর উইংওয়াল ধসে পড়া, ফাটল ও অ্যাপ্রোচ সড়কের কাজ অসম্পূর্ণ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে ঠিকাদারের ব্যর্থতা রয়েছে। ত্রুটিগুলো দ্রুত সংশোধন করে কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নির্মাণকাজের অগ্রগতি যাচাই করে বিল দেওয়া হয়েছে। কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজের অতিরিক্ত টাকা দেওয়া হয়নি।
সেতুগুলোর নির্মাণমান, কাজের অগ্রগতি এবং বিল পরিশোধের হিসাব নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, সরকারি অর্থে নির্মিত এসব অবকাঠামোর গুণগত মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি অসমাপ্ত কাজ দ্রুত শেষ করা জরুরি।
