আইইএ বৈঠকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে ফের অঙ্গীকার মন্ত্রীদের

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪৪ পিএম

বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন এ খাতের নেতারা। ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) এর দুদিনব্যাপী মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এ অঙ্গীকার করেন তারা। আইইএ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে একথা জানানো হয়েছে।

এবারের বৈঠকে রেকর্ডসংখ্যক ৫৪টি দেশের জ্বালানি খাতের ঊর্ধ্বতন সরকারি প্রতিনিধি অংশ নেন, যার মধ্যে প্রায় ৪০ জন ছিলেন মন্ত্রী পর্যায়ের। এ ছাড়া ৫৫টি শীর্ষ জ্বালানি কোম্পানির নির্বাহীরা অংশ নেন—যাদের সম্মিলিত বাজারমূল্য ১৪ ট্রিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া বৈঠকে বিভিন্ন আন্তঃসরকারী সংস্থার নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি চাহিদা বৃদ্ধি ও জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সহযোগিতায় আইইএ-এর কেন্দ্রীয় ভূমিকার বিষয়টি বৈঠকে পুনরায় নিশ্চিত করা হয়। পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রতি বিস্তৃত সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়ে অধিকাংশ মন্ত্রী কপ ২৮-এর ফলাফলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বৈশ্বিক নেট-জিরো নির্গমনের পথে অগ্রসর হওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

নেদারল্যান্ডসের উপপ্রধানমন্ত্রী ও জলবায়ু মন্ত্রী সোফি হারমানস প্রকাশিত চেয়ারস সামারি অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ দেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পাশাপাশি নিরাপদ ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে জ্বালানি রূপান্তরের ভূমিকার ওপর জোর দেয়। তিনি বলেন, নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি—এবং অনিশ্চিত বিশ্বে টিকে থাকতে সক্ষম স্থিতিশীল ব্যবস্থা—যা আমাদের অগ্রাধিকার হতে হবে।

এবারের সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে জলবায়ু নীতি নিয়ে ভিন্নমতের প্রেক্ষাপটে। সম্মেলনে মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট আইইএ-কে জলবায়ু বিষয়ক অগ্রাধিকার কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে অধিকাংশ মন্ত্রী বাস্তবসম্মত ও অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক পথ হিসেবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তরের প্রতি সমর্থন দেন।

আইইএ-এর নির্বাহী পরিচালক ফেইথ বিরল এবারের সম্মেলনকে সংস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আয়োজন হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জ্বালানি খাতের পরিবর্তনশীল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সংস্থাটির নিরপেক্ষ তথ্য ও বিশ্লেষণ আগের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ।

বৈশ্বিক জ্বালানি শাসন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে সদস্য দেশগুলো সর্বসম্মতিক্রমে ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ভারত ও ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক জোরদারের সিদ্ধান্ত নেয়। কলম্বিয়াকে আইইএ-এর ৩৩তম সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, ব্রাজিল ও ভারত পূর্ণ সদস্যপদের পথে অগ্রসর হচ্ছে এবং ভিয়েতনাম অ্যাসোসিয়েশন দেশ হিসেবে আইইএ পরিবারে যুক্ত হয়েছে। এসব সংযোজনের ফলে আইইএ ও তার অংশীদারদের আওতায় এখন বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবহারের ৮০ শতাংশেরও বেশি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যা এক দশক আগে ছিল ৪০ শতাংশের কম।

নেতাদের আলোচনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ গুরুত্ব পায়। যুক্তরাজ্যের জ্বালানি মন্ত্রী অ্যাড মিলিব্যান্ড বলেন, দীর্ঘমেয়াদে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণ, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনে অনেক দেশের জন্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সবচেয়ে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী উপায়।

ইউরোপীয় কমিশনার ড্যান জারগেনসেন বলেন, ইউরোপের জন্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তর কেবল ডিকার্বনাইজেশন নয়; এটি শিল্প প্রতিযোগিতা ও নিরাপত্তা কৌশলেরও অংশ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুতায়ন ও আধুনিক গ্রিডকে তিনি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বর্ণনা করেন, যা মূল্য কমাতে এবং সরবরাহজনিত ধাক্কা থেকে ভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে সহায়তা করে।

সমেলনে ভিডিও বার্তায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি জ্বালানি রূপান্তরে দেশগুলোকে দিকনির্দেশনা দিতে আইইএ-এর বিশ্লেষণী দক্ষতার প্রশংসা করেন।

মন্ত্রিসভা বৈঠকে আইইএ-এর ‘ক্রিটিক্যাল মিনারেলস সিকিউরিটি প্রোগ্রাম’-এর আওতায় সহযোগিতা সম্প্রসারণের অনুমোদন দেওয়া হয়, যাতে নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি ও ব্যাটারি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় খনিজের বাড়তি চাহিদার প্রেক্ষাপটে সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা জোরদার করা যায়। ঝুঁকি কমাতে উন্নত ডেটা টুলস ও যৌথ পদক্ষেপ—যেমন মজুত নির্দেশিকা—গ্রহণের আহ্বান জানান মন্ত্রীরা।

এ ছাড়া ‘ক্লিন কুকিং অ্যালায়েন্স’-কে আইইএ-এর সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা পরিচ্ছন্ন রান্না সমাধান সম্প্রসারণে সংস্থাটিকে শীর্ষ বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে। বিশ্বে এখনো দুই বিলিয়নের বেশি মানুষ পরিচ্ছন্ন রান্নার সুবিধাবঞ্চিত—যা জ্বালানি রূপান্তরের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন নেতারা।

মন্ত্রিসভায় পাঠানো এক বার্তায় জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুটেরেজ বলেন, বিশ্ব এখন “পরিচ্ছন্ন জ্বালানির যুগে” প্রবেশ করেছে। অধিকাংশ অঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে সস্তা ও দ্রুতবর্ধনশীল উৎস। তিনি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস লক্ষ্য অনুযায়ী জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সুশৃঙ্খল ও ন্যায়সঙ্গত রূপান্তরের জন্য একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের আহ্বান জানান।

ই৩জি-এর জ্বালানি রূপান্তর কর্মসূচির প্রধান মারিয়া পাসটুকোভা বলেন, ২০২৬ সালে জ্বালানি নিরাপত্তা ক্রমেই নির্ভর করছে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, বৈচিত্র্যময় সরবরাহ শৃঙ্খল এবং পরিকল্পিত রূপান্তরের ওপর। জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে নীতিনির্ধারণে কঠোর ও স্বাধীন বিশ্লেষণ বজায় রাখার গুরুত্বও তিনি তুলে ধরেন।

সার্বিকভাবে, প্যারিস বৈঠক অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে একটি বিস্তৃত ঐকমত্যের প্রতিফলন ঘটিয়েছে যে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও টেকসই বৈশ্বিক জ্বালানি ভবিষ্যৎ গঠনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন