উৎপাদন ব্যয় বেড়ে বিপাকে নীলফামারীর ধান চাষিরা

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১১ এএম

সার-বীজ-কীটনাশকের বাড়তি দাম, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির মধ্যে আমন মৌসুমের মাঝপথে ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচের খরচও বেড়ে গেছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ধানের বাজারদর নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার আমন চাষিরা।

এদিকে প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিতে না পারায় কোথাও কোথাও জমিতে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সময়মতো সেচ না পেলে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।   

চলতি আমন মৌসুমে ডিমলা উপজেলায় ২১ হাজার ২৪১ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। 

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ ২৪ হাজার ৪০০ হেক্টর। এর মধ্যে এক ফসলি জমি ১ হাজার ৩১০, দুই ফসলি ১৩ হাজার ৫২০, তিন ফসলি ৮ হাজার ৬৮০, চার ফসলি ৮৫০ এবং পাঁচ ফসলি জমি ৪০ হেক্টর। সব মিলিয়ে ফসলি জমির পরিমাণ ৫৭ হাজার ৭৯০ হেক্টর।

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, আমন ধান মূলত বর্ষার পানির ওপর নির্ভরশীল হলেও বৃষ্টির ঘাটতি হলে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের মাধ্যমে জমিতে পানি দিতে হয়। গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। ফলে ধানের পরিচর্যার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচ ব্যয় বেড়েছে। বাড়তি এই খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেক কৃষক।

বালাপাড়া ইউনিয়নের সোলেমানের চৌপতি গ্রামের কৃষক শরিফ মিয়া বলেন, ‘ডিজেলের দাম বাড়ার পর সেচের খরচ বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের খরচও বেশি। ধান উৎপাদনে এত বেশি খরচ হচ্ছে; কিন্তু বিক্রির সময় সেই খরচ উঠবে কি না- তা নিয়ে চিন্তায় আছি।’

একই গ্রামের কৃষক সাইদুর মণ্ডল বলেন, ‘জমিতে সময়মতো পানি না দিলে ধানের ফলন কমে যেতে পারে। কিন্তু সেচের খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী পানি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিকে খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে ধানের দাম নিয়েও নিশ্চয়তা নেই।’

নাউতারা ইউনিয়নের আকাশকুড়ি গ্রামের কৃষক শরিফ উদ্দিন বলেন, ‘সেচের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকে এখন বৃষ্টির অপেক্ষায় আছেন। সময়মতো বৃষ্টি না হলে সেচ দিতে হবে। প্রতিবার পানি দিতে বাড়তি টাকা লাগছে। এতে ধান চাষ করে লাভ থাকবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।’

একই গ্রামের কৃষক সুরুজ আলী বলেন, ‘বীজ, সার, কীটনাশক থেকে শুরু করে জমি তৈরি, শ্রমিক, সেচ, ধান কাটা ও মাড়াই পর্যন্ত সবকিছুর খরচ বেড়েছে। ধানের দাম যদি সেই তুলনায় না বাড়ে, তাহলে কৃষকের লোকসান হবে। ধারদেনা করে চাষ করলে সেই টাকা পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে যাবে।’

কৃষকেরা জানান, আমন চাষে শুধু সেচ নয়, জমি প্রস্তুত, বীজ, ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও অন্যান্য সার, কীটনাশক, আগাছানাশক, শ্রমিকের মজুরি, ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহনসহ প্রায় প্রতিটি ধাপেই ব্যয় বেড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার এবং কৃষি উপকরণ ও ফসল পরিবহনেও অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে।

কৃষকদের দাবি, সেচের খরচ কমাতে সাশ্রয়ী ও আধুনিক সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ, সার-বীজ-কীটনাশকের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা, কৃষি উপকরণ ও ফসল পরিবহন ব্যয় কমানো এবং উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের ন্যায্য বাজারদর নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মীর হাসান আল বান্না বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও কৃষি উপকরণের বাড়তি মূল্যের কারণে আমন চাষিদের উৎপাদন ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। তবে সঠিক সময়ে সেচ, সুষম সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই ও পোকামাকড় দমনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কৃষকদের পানি ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কৃষকেরা যাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করেন, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ধানের কাঙ্ক্ষিত ফলন নিশ্চিত করতে নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন, রোগবালাই পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে কৃষকের লাভজনকতা ধরে রাখাই কৃষি বিভাগের অন্যতম লক্ষ্য।’

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন