মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৩৩ জন। এর মধ্যে ১০ জন পুলিশ, একজন সেনাবাহিনী, একজন বিমানবাহিনী, একজন র্যাব, ৪ জন ডিবি পুলিশ, একজন বিজিবি, ২ কোস্টগার্ড এবং ১৩ জন যৌথবাহিনী কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিহতদের মধ্যে ১১ জনকে নির্যাতনে, ১৬ জনকে গুলিতে এবং ৬ জন পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্যাতনের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে দায়মুক্তির সংস্কৃতি চালু থাকা এবং এটি বন্ধে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ২০১৩-এর বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণেই বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থার হেফাজতে নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের ঘটনাগুলো ঘটেই চলেছে। উপদেষ্টা পরিষদ ২০২৫ সালের ১০ জুলাই নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক আচরণ বা শাস্তির বিরুদ্ধে জাতিসংঘের ঐচ্ছিক প্রটোকল (অপক্যাট) সংযুক্তি সংক্রান্ত প্রস্তাবটি অনুমোদন করে। জাতিসংঘের চুক্তি ডাটাবেস অনুযায়ী, সংযুক্তির তারিখ ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই নিশ্চিত করা হয়েছে এবং এটি বাংলাদেশে ২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়েছে।
এতে বলা হয়, গত ১৩ মার্চ চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ থানা হেফাজতে শাওন কাবি রিজা নামে এক ছাত্রদল নেতাকে এসআই খোকনের নেতৃত্বে তিনজন কনস্টেবল চোঁখ বেঁধে নির্যাতন করে। গত ২৫ জুন সুনামগঞ্ছের ব্যবসায়ী নাসির মিয়াকে ব্যবসা সংক্রান্ত দ্বন্দ্বে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তুলে নিয়ে যায়। ঢাকার ডিবি অফিসে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে তার কাছ থেকে ৫ লাখ ৭৪ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরে মুচলেকায় জোরপূর্বক স্বাক্ষর রেখে ছেড়ে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
নির্যাতন ছাড়াও এই সময়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের দুর্বৃত্তায়নের অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে টাকা আদায়, মামলা বাণিজ্য, মামলার বাদীকে থানায় নিয়ে মারধর, আদালতগুলোর গারদখানায় বন্দি আসামিদের স্বজনদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ, ঢাকার
আদালতে ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী কয়েকজনের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, বদলি বাণিজ্য ও কোর্ট হাজতে বন্দিদের অবৈধ সুযোগ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এই সময়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকা, মিথ্যা মাদক মামলা দেওয়া, মাদকসহ আটকের পর ছেড়ে দেওয়া, ধর্ষণচেষ্টা ও চাঁদাবাজি, ঘুষ গ্রহণ, স্বর্ণালঙ্কার ও টাকা লুট, যুবককে কুপিয়ে জখম করার পরও থানায় মামলা না নেওয়া, ঘুষ চাওয়ার অডিও রেকর্ড ফাঁস হওয়ায় ব্যবসায়ীকে হুমকি, অভিযুক্তের সঙ্গে নামের মিল থাকায় গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো, মামলায় ফাঁসিয়ে দিয়ে টাকা দাবি, নিহত শিশুর পরিবারের কাছ থেকে ঘুষ আদায় এবং টাকা লুট করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে মৃত্যু
২০২৫ সালে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে ১০ জন অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছে। হেফাজতে মৃত্যুর পর থানা পুলিশ দাবি করে থাকে যে, অসুস্থ হয়ে অথবা থানা হাজতে ফাঁস লাগিয়ে অভিযুক্তরা আত্মহত্যা করেছেন। পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত পুলিশকে দিয়েই করানো হয়ে থাকে। ফলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
গত ১২ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের টঙ্গী থানা হাজতে রনি মিয়া নামে এক নির্মাণ শ্রমিক অসুস্থ হয়ে মারা যান বলে পুলিশ দাবি করেছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলায় চোর সন্দেহে মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ নামে এক যুবককে পিটুনী দিয়ে ছলিমগঞ্জ অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্পে সোপর্দ করা হয়। পুলিশ আবদুল্লাহকে আদালতে না পাঠিয়ে চারদিন ক্যাম্পে তাদের হেফাজতে আটক রাখে। পুলিশ হেফাজতেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আব্দুল্লাহ মারা যান।
এই ঘটনায় নিহত আব্দুল্লাহর বড় ভাই শাকিল মিয়া বাদী হয়ে মামলা দায়ের করলে পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই মহিম উদ্দিনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।
