চট্টগ্রাম বন্দর ইজারার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জনগণকে না জানিয়ে বা গোপন চুক্তির মাধ্যমে নেওয়া হলে তা সরাসরি গণস্বার্থের পরিপন্থী- এমন মন্তব্য করেছেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। তাঁর মতে, বন্দরসংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ আলোচনার মধ্য দিয়ে শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্পৃক্ত করে গ্রহণ করা জরুরি।
শুক্রবার (৬ জানুয়ারি) বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে ‘চট্টগ্রাম বন্দর সুরক্ষা বনাম বন্দর অচলের রাজনীতি’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভার আয়োজন করে বন্দর সুরক্ষা কমিটি। অনুষ্ঠানে বন্দরের শ্রমিক, বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচক ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
ফরহাদ মজহার বলেন, নন-ডিসক্লোজার বা গোপনীয়তার শর্তের আড়ালে জনগণকে অন্ধকারে রেখে বন্দর ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ। তাঁর মতে, দেশি সক্ষমতাকে অস্বীকার করে বিদেশি কোম্পানির হাতে বন্দর তুলে দেওয়ার যুক্তি বিপজ্জনক। এতে শুধু মুনাফার বিষয় নয়, বরং সংকটকালে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
গণসার্বভৌমত্বের প্রসঙ্গে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষায়, বন্দর ও গণসার্বভৌমত্ব একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আমলাতান্ত্রিকভাবে একতরফা নেওয়া হলে গণসার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হয়। তিনি আরও বলেন, সংসদের সার্বভৌমত্বের নামে ক্ষমতা ধীরে ধীরে লুটেরা ও মাফিয়া শ্রেণির হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, আর নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ পরোক্ষভাবে সেই কাঠামোকেই বৈধতা দিচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে ফরহাদ মজহার বলেন, এই বন্দর দেশের অর্থনীতি, সামরিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় চট্টগ্রাম বন্দরের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি মনে করেন, শ্রমিকদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা থাকলেও বন্দর অচল হয়ে পড়লে সেটিকে বিদেশি কোম্পানির হাতে বন্দর তুলে দেওয়ার যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। তাই শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমেই গণসার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সভায় শুরুতে বক্তব্য দেন বন্দর সুরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক আহমেদ ফেরদৌস। পরে কবি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মোহাম্মদ রোমেল ‘চট্টগ্রাম বন্দর সুরক্ষা বনাম বন্দর অচলের রাজনীতি’ শীরোনামে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। আলোচনায় আরও অংশ নেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমান, চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন, মো. হুমায়ুন কবীরসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন বলেন, বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত একাধিক প্রকল্প বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা বন্দরের স্বার্থ ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের জন্য হুমকি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এনসিটি বিদেশিদের হাতে গেলে প্রায় ৮০০ কর্মচারী কর্মহীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বন্দর রক্ষা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং দেশি দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান।
একই সংগঠনের আরেক সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর অভিযোগ করেন, কৃত্রিমভাবে আয় কম দেখিয়ে চুক্তির যৌক্তিকতা তৈরি করা হচ্ছে এবং দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করতে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, শুরুতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা হলেও এখন তাদের সংশ্লিষ্ট আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যার বোর্ড ও কাঠামো সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য নেই। চট্টগ্রাম বন্দরের স্বার্থ, স্বচ্ছতা ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এই চুক্তির পূর্ণ তদন্ত এবং সব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানান তিনি।
