ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মরাপুকুরপাড় গ্রামের শামসুজ্জামান সবুজ ও স্ত্রী কুলসুম আক্তার দম্পতি। ২০২০ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে কুলসুম একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। মাত্র চার মাস বয়সে পুত্রসন্তানের মৃত্যু হয়। এরপর ওই দম্পতি সন্তানের জন্য বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছিলেন। চিকিৎসক দেখিয়েও সুফল মেলেনি। তবে চলতি বছর তারা সন্তান না হওয়ার কারণ হিসেবে জানতে পারেন কুলসুম আক্তারের অনুমতি ছাড়াই তার লাইগেশন করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের সময় গাইনি ও স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ জিনান রেজা অনুমতি ছাড়াই কুলসুমের দুই ফেলোপিয়ান টিউব কেটে বন্ধ দিয়েছিল (লাইগেশন)। চিকিৎসকের এই ভুলে বন্ধ্যত্বকরণের কবলে পড়ে সন্তান নিতে পারছেন না গৃহবধূ কুলসুম।
তবে হাসপাতালের ভাষ্য, গাইনি ওয়ার্ডে লাইগেশনের রেজিস্ট্রারে এই রোগীর বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। রোগীসহ পরিবারের সম্মতি ছাড়া লাইগেশন সম্পন্ন হয় না। ওই রোগী কোথায় কী করেছেন, তিনিই ভালো বলতে পারবেন।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে কোথায়, কীভাবে এই লাইগেশন হয়েছে। এদিকে এ ঘটনায় গত ২১ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কাছে লিখিত আবেদন দিয়ে তৎকালীন চিকিৎসার মূল নথিপত্র চেয়েছেন ভুক্তভোগী স্বামী।
অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ২ জানুয়ারি দ্বিতীয় সন্তান প্রসবের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে ভর্তি হন কুলসুম আক্তার। ওই দিন দুপুরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিনি একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। সে সময় অস্ত্রোপচার করান চিকিৎসক জিনান রেজা। এর চার দিন পর ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফেরেন তারা। কিন্তু ২০২০ সালের ১০ এপ্রিল শিশুটি মারা যায়। সন্তান হারিয়ে দম্পতি পুনরায় সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করেন। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে স্থানীয় চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ ও কবিরাজি চিকিৎসার পেছনে ঘুরেও কোনো ফল না পেয়ে তারা হতাশ হয়ে পড়েন।
সন্তান ধারণ না হওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে এক চিকিৎসকের পরামর্শে কুলসুম আক্তারের পরীক্ষা করানো হলে তার জরায়ুর দুটি ফ্যালোপিয়ান টিউব বন্ধ ধরা পড়ে। বিষয়টি নিশ্চিত হতে গত ২ এপ্রিল কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কুলসুম আক্তারের ল্যাপারোস্কোপিক অস্ত্রোপচার করা হলে সেখানেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
সন্তান পাওয়ার শেষ চেষ্টায় দম্পতি ছোটেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। গত ২৩ আগস্ট সেখানে ভর্তি হন। গত ৮ সেপ্টেম্বর চিকিৎসকরা কুলসুম আক্তারের ‘মাইক্রোসার্জিক্যাল রিক্যানালাইজেশন’ (টিউব পুনর্সংযোগ) অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন। ওসমানী মেডিকেল কলেজের অপারেশন নোটে উল্লেখ করা হয়, কুলসুমের ডান ও বাম উভয় পাশের ফ্যালোপিয়ান টিউব ‘ইস্থমাস’ অংশে শক্ত করে লাইগেশন (বাঁধা) ও কাটা ছিল। চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউব দুটির ব্লতেজ অপসারণ করে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করেন।
এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের ২০২০ সালের ২ জানুয়ারির অস্ত্রোপচার কক্ষের রেজিস্টার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রেজিস্টারের ২০ নম্বর ক্রমিকে কুলসুমের অপারেশনের বিবরণে শুধু লোয়ার ইউটেরিন সিজারিয়ান সেকশন উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ সরকারি নথিতে লাইগেশন করার কোনো তথ্যের উল্লেখ নেই।
ভুক্তভোগীর স্বামী মো. শামসুজ্জামান সবুজ বলেন, ছয়টি বছর আমার চোখের জলে কেটেছে। এখনো আমার স্ত্রী অসুস্থ। বেঁধে রাখা টিউব জোড়া লাগানো হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন বাধা থাকায় টিউব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখন সন্তান ধারণের সম্ভাবনা খুব কম। আমি চিকিৎসকের বিচার চাই।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে চিকিৎসক জিনান রেজা বলেন, এটি ২০২০ সালের ঘটনা। একজন রোগীর সব চিকিৎসা কার্যক্রম রেজিস্টার খাতায় লেখা থাকে। ওই রোগীর স্থায়ী লাইগেশন হয়েছে এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ হাসপাতালের ওটির রেজিস্ট্রারে নেই। ওই রোগীর কোনো লাইগেশন করা হয়নি। আমি অনুমতি ছাড়া রোগীর লাইগেশন করিনি। রোগী ও তার স্বজনের অনুমতি ছাড়া স্থায়ী বন্ধ্যত্বকরণ করা হয় না। আমরা কুমিল্লা মেডিকেলের প্রতিবেদনের বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা জানিয়েছে তারা ওই রোগীর টিউব ব্লকের কথা উল্লেখ করেছে। আর টিউব ব্লক ইনফেকশন বা নানা কারণে হয়ে থাকতে পারে। আমরা সাধারণত দলগতভাবে কাজ করি। তখনও আমি দলগত কাজের অংশ ছিলাম।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক রতন কুমার ঢালী বলেন, ওই রোগীর স্বজন হাসপাতালে একটি অভিযোগ করেছিল। ছয় বছর আগের ঘটনা এটি। নথিপত্র ঘেঁটে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের তথ্য রেজিস্ট্রারে আছে। কিন্তু ওই রোগীর লাইগেশন করা হয়েছে এমন কোনো তথ্য হাসপাতালের নথিতে নেই। গৃহবধূর স্বামীর সামনেই সব নথি উপস্থাপন করা হয়েছে। ওই রোগীর অন্যান্য প্রতিবেদন দেখে আমাদের ধারণা, অন্য কোথাও তার অস্ত্রোপচার হয়ে থাকতে পারে।
এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোগীর অনুমতি ছাড়া সার্জনরা লাইগেশন করার কোনো সুযোগ নেই। সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতালের ওটি নোট কিংবা কোথাও ওই রোগীর লাইগেশনের কথা উল্লেখ নেই। ঘটনাটি আসলে কী ঘটেছে, তা তদন্ত করে দেখতে হবে।
