নীপিড়ক সরকার পার পেয়ে যায় জনগণের নীরবতার কারণে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জবাবদিহিতা না থাকলে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না বলে মন্তব্য করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি’ (এইচআরএসএস) আয়োজিত এক মতিবিনিময় সভায় এমন মন্তব্য করেন তারা।
আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, গণভোট ও মানবাধিকার পরিস্থিতির পর্যালোচনা: নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কমিশনার নুর খান লিটন বলেন, ‘নির্বাচনের পর আমাদের প্রত্যাশা ছিল সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ হবে। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, চলমান পরিস্থিতি আমাদের ভাল কোনো বার্তা দিচ্ছে না। রাজনৈতিকদলগুলোর কাছে পরিবর্তণের প্রত্যাশা করা যায়। কিন্তু পরিবর্তণ হবে কিসের ভিত্তিতে। চাপ না দিলে তো রাজনৈতিক পরিবর্তণ হবে না।’
আলোকচিত্রী শহীদুল আলম বলেন, ‘অতীতে নিশ্চই আমাদের নীপিড়নমুলক সরকার ছিল। কিন্তু নীপিড়ক সরকার পার পেয়ে যায় আমাদের নীরবতার কারণে। সরকারগুলোর কাছ থেকে কঠোরভাবে আমরা জবাবদিহিতা আদায় করতে পারিনি। এজন্য প্রতিটি জায়গায় আমাদের ভূমিকা রাখতে হবে।’
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, ‘অনির্বাচিত সরকারের চেয়ে নির্বাচিত সরকার ভাল। অন্তত কিছুটা জবাবদিহিতা তো আদায় করা যায়। জুলাই অভ্যূত্থানের মর্মবানী আমি ব্যক্তিগতভাবে ধারণ করি। কিন্তু এটি দ্বিতীয় স্বাধীনতা কি না, সে প্রশ্ন থেকে যায়। বাংলাদেশের নাম পরিবর্তণের আওয়াজ উঠেছিল। কিন্তু বিপ্লবীদের তত্ত্বাবধানে তো সরকার গঠন হয়নি। সরকার হয়েছে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে। উচ্চ আদালত তাতে সম্মতি দিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো বিগত অন্তর্বতী সরকারের উপদেষ্টাদের কেউ কেউ নিজেদের বিপ্লবী বলে দাবি করতেন।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট ছিল। এনসিপি, কিছু বাম দল তাতে স্বাক্ষর করেনি। এর অর্থ হলো এই সনদ সর্বসম্মত ছিল না। এখন আমাদের ভবিস্যতের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।’
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েবে আমির ডা. মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘জামায়াতের আদশে নারীর বিষয়ে প্রতিবন্ধকতার কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনে আমাদের নারী প্রতিনিধি না থাকার বিষয়ে কথা উঠেছে। কিন্তু বিগত ১৫ বছরে (আওয়ামী লীগের সময়ে) আমরা পুরুষেরাই ঠিকমত রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে পারিনি। প্রস্তুতি না থাকায় কোনো নারীকে আমরা মনোনয়ন দিতে পরিনি।’ বিএনপি সংবিধানের দোহাই দিয়ে জুলাই অভ্যূত্থানের চেতনাকে অস্বীকার করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মতবিনিময় সভায় আরো বক্তব্য দেন এইচআরএসএস’র চেয়ারপারসন ব্যারিস্টার শাহজাদা আল আমিন কবির, সুপ্রিম কোটের্র আইনজীবী শিহাব উদ্দিন খান, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) প্রোগ্রাম বিশেষজ্ঞ মাহপারা আলম, মানবাধিকারকর্মী জাহিদ হাসান, জুলাই অভ্যূত্থানে দৃষ্টিশক্তি হারানো তাহমিদ হুজায়ফা, যাত্রাবাড়িতে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুবরণকারী বডি বিল্ডার ফারুক আহমেদের স্ত্রী ইমা আক্তার, ২০১৮ সালে রাজধানীর মিরপুরে গুমের শিকার হয়ে ফিরে না আসা মোহনের বাবা জামশেদ ইসলাম প্রমুখ।
মতবিনিময় সভায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে এইচআরএসএস’র পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, নির্বাচনের সামগ্রিক পরিবেশ তুলনামুলক শান্ত, নিয়ন্ত্রিত এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ ছিল। কিন্তু প্রার্থীতা বাচাই, যোগ্যতা নির্ধারণে অসামঞ্জস্য ও বৈপরিত্য, ঋন খেলাপি, দ্বৈত নাগরিকধারীদের প্রার্থীতা, নির্বাচন পূর্ব ও পরবর্তী সহিংসতা অনিয়মের অভিযোগ, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ঘটনা দেখায় যে, সামগ্রিক নির্বাচনী পরিবেশ এখনো অত্যন্ত ভঙ্গুর।
