জলবায়ু সহনশীল, স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল আউশের জাত উদ্ভাবন

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৭ পিএম

প্রায় ১০ বছর ধরে চলা গবেষণাটিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের দুই শিক্ষক অধ্যাপক ড. এম ময়নুল হক ও অধ্যাপক ড. মো. মসিউল ইসলাম। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি নামের আদ্যক্ষর অনুসারে ‘জিএইউ-৪’ নামে নতুন জাতটির নামকরণ করা হয়েছে।

আউশ ধান মূলত এপ্রিলে রোপণ করা হয়। এ সময়ে উচ্চ তাপমাত্রা, কালবৈশাখীর মতো নানা প্রতিকূল পরিবেশ থাকায় বোরো-আমনের তুলনায় দেশে আউশের চাষ কম হয়। পাশাপাশি প্রতিকূল পরিবেশের কারণে ফলনও তুলনামূলক অনেক কম হয়। গবেষকরা বলছেন, তাদের উদ্ভাবিত এ জাত আগামীতে আউশ ধানের বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

গবেষক অধ্যাপক ড. মো. মসিউল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আউশ ধানের মৌসুমটা শুরু হয় এপ্রিলে। সে সময় কালবৈশাখী, কম বৃষ্টিপাত ও তাপপ্রবাহ বেশি থাকে। সেজন্য আউশ মৌসুম কৃষির জন্য সবচেয়ে ভালনারেবল। ভালো কোনো জাত না থাকার কারণে আউশ থেকে দেশের কৃষকরা মুখ ফিরে নিচ্ছেন। আমাদের নতুন জাতটি খরার মধ্যেও সারভাইভ করতে পারে। এটি চাষে পানি অনেক কম লাগে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় টিকে থাকতে পারে। এটির উৎপাদনশীলতাও অন্যান্য জাতের তুলনায় বেশি।’

‘জিএইউ ধান-৪’ অনুকূল পরিবেশে হেক্টরপ্রতি পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায় বলে দাবি করেছেন গবেষকরা। এ জাতের ধান চাষে প্রতি হেক্টরে মাত্র ২৫-৩০ কেজি বীজ লাগে। যেটি কৃষকের জন্য অর্থনৈতিকভাবেও সুবিধাজনক।

গবেষক ড. মো. মসিউল ইসলাম জানিয়েছেন, উন্নত এ জাতটি বিভিন্ন রোগবালাই প্রতিরোধক হওয়ার কারণে সাধারণ জাতের তুলনায় এটি গড়ে ১০-১৫ শতাংশ বেশি ফলন দিতে সক্ষম। ৯০-১০০ দিনের মধ্যে এ জাতের ফসল ঘরে তোলা যায়। দ্রুত পরিপক্ব হওয়ায় একই জমিতে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। স্বল্প সময়, পানি কম লাগার কারণে এটি দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।

জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (এনএসটি) বিভাগ এবং গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে গবেষণা কার্যক্রমটি পরিচালিত হয়েছে। এমন উদ্ভাবনের জন্য দুই কৃষিতত্ত্ববিদকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান।

অধ্যাপক মসিউল ইসলাম আরো বলেন, ‘এটা (নতুন জাত) আমাদের নিরলস পরিশ্রমের একটি ফসল। কৃষকরা যাতে উপকৃত হন সেজন্যই আমাদের এত পরিশ্রম। আমি মনে করি এ ধান যখন মাঠপর্যায়ে যাবে তখন কৃষকরা উপকৃত হবেন। আউশ মৌসুমে কৃষকরা ধান চাষ করতে চায় না। নতুন এ জাতে উৎপাদনশীলতা বেশি হওয়ার, রোগবালাই কম হওয়া মতো নানা সুবিধা কৃষককে আউশ চাষে উদ্বুদ্ধ করবে।’

জানা গেছে, বেলে, দো-আঁশ বা এটেল দো-আঁশ মাটি এ জাতের চাষের জন্য ভালো।

গবেষণা অনুযায়ী, ‘জিএইউ ধান ৪’-এর জন্য বীজতলায় বীজ ফেলার উপযুক্ত সময় এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ। কাদা জমিতে ২০-২২ দিনে এর চারা রোপণ করতে হয়।

নতুন জাতটি ২০২২ সালের আউশ মৌসুমে এর আঞ্চলিক অভিযোজন পরীক্ষা করা হয়। পরের বছর আঞ্চলিক উপযোগিতা যাচাই এবং ২০২৪ সালে বাংলাদেশ বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির তত্ত্বাবধানে দেশের ১০টি অঞ্চলে মাঠপর্যায়ে মূল্যায়ন করা হয়। সব পরীক্ষায় স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চফলনশীল বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত হওয়ায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় বীজ বোর্ডের সভায় ‘জিএইউ ধান ৪’ নামের জাতটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রদান করা হয়।

তিনি বলেন, ‘‌জিএইউ ধান ৪ উদ্ভাবন আমাদের গবেষকদের অধ্যবসায়, মেধা ও নিষ্ঠার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এ জাতটি কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে এবং ভবিষ্যতে দেশের কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।’

দেশে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯ লাখ ৭৭ হাজার ২৪১ হেক্টর জমিতে ২৮ লাখ ৮১ হাজার ৫৮৬ টন আউশ উৎপাদন হয়। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ছিল ২ দশমিক ৯৫ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ১০ লাখ ৮৫ হাজার ৩১৭ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। যেখানে হেক্টরপ্রতি গড়ে ২ দশমিক ৯৭ টন হিসাবে ৩২ লাখ ২২ হাজার ৭৪০ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর