জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেকের সাম্প্রতিক বক্তব্যের জেরে তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ ও কটূক্তি করা অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মন্তব্য করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সহযোগী সংগঠন ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্স।
সংগঠনটির মুখপাত্র মুফতি রফিকুল ইসলাম আইনী সোমবার (৫ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে এ মন্তব্য করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, মুফতি আবদুল মালেক দীর্ঘদিন ধরে ইলমি অঙ্গনে অবদান রেখে আসছেন। জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও দায়িত্বশীল ধর্মীয় অবস্থানের কারণে তিনি আলেম সমাজে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য। কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকে নিয়ে তার বক্তব্যের সঙ্গে কারও মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তবে সেই মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশালীন মন্তব্য বা বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য অনাকাঙ্ক্ষিত।
কোনো আলেমের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে যুক্তি, প্রমাণ ও শালীনতার সঙ্গে তার জবাব দেওয়া উচিত বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কটূক্তিকে সুস্থ মতবিনিময়ের অংশ হিসেবে দেখা যায় না। কেউ ব্যক্তিগতভাবে মুফতি আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য দিলে তার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে বলেও মন্তব্য করা হয়।
মুফতি রফিকুল ইসলাম আইনী বলেন, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এক বিষয় নয়। রাজনৈতিক কোনো বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণে কোনো আলেমের ইলমি অবস্থান, মর্যাদা কিংবা ধর্মীয় বক্তব্যকে অস্বীকার করা উচিত নয়। ধর্মীয় বিষয়ে মতভেদ হলে রাজনৈতিক বিবেচনার আগে জ্ঞানী ও দায়িত্বশীল আলেমদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক আনুগত্য যেন ইলমি বিচারবোধের বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকেও সতর্ক থাকা দরকার।
বিবৃতিতে বিএনপি ও এনসিপিকে মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দল হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, দল দুটির রাজনৈতিক পরিচয়ের মূল ভিত্তি সরাসরি ইসলামি দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের ইসলামি রাজনৈতিক দল হিসেবে উপস্থাপন করে। ফলে ধর্মীয় মূল্যবোধ, বিধিবিধান ও ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তা তাদের রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দলটির সঙ্গে কেউ সাংগঠনিকভাবে সম্পৃক্ত হলে তার কাছ থেকে সেই রাজনৈতিক ও আদর্শিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়।
তবে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার অর্থ কোনো আলেমকে তার ইলম, স্বাধীনতা বা নীতিগত অবস্থান দলীয় রাজনীতির কাছে সমর্পণ করা নয় বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। বরং রাজনীতিতে থাকা আলেমদের দায়িত্ব আরও বেশি। ইলম, নৈতিকতা ও ন্যায়বোধের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিসরকে সঠিক পথে পরিচালিত করার চেষ্টা তাদের করা উচিত।
বিবৃতিতে বলা হয়, মূল বিষয় কোনো ব্যক্তি বা দলের অন্ধ সমর্থন কিংবা বিরোধিতা নয়; বরং একজন আলেমের ধর্মীয় নেতৃত্ব, রাজনীতিতে নৈতিকতা ও ন্যায়বিচার এবং জাতীয় স্বার্থে দায়িত্বশীল অবস্থানই এখানে বিবেচ্য। রাজনৈতিক মতপার্থক্য স্বাভাবিক হলেও তা যেন অসম্মান, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা কোনো আলেমের ইলমি মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার কারণ না হয়।
কোনো আলেমের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা যেতে পারে, তবে একই সঙ্গে তার ইলমি মর্যাদা ও ব্যক্তিগত সম্মান বজায় রাখা সম্ভব বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে, সম্প্রতি এক মাহফিলে মুফতি আব্দুল মালেক বিভিন্ন প্রসঙ্গে ‘নসিহতমূলক’ বক্তব্য দেন। এ সময় ইসলাম প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রসঙ্গক্রমে তিনি জামায়াতে ইসলামী ও মাওলানা মামুনুল হকের বিষয়ে কথা বলতে শোনা যায়।
ইসলাম প্রতিষ্ঠায় কারও অন্ধ অনুসরণ করা যাবে না উল্লেখ করে বায়তুল মোকাররমের খতিব বলেন, ‘আমাদের দেশের শীর্ষস্থানীয় শাইখুল হাদিস সাহেবের ছেলে (মামুনুল হক), এখন সে যদি সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনাকারীদের সাথে (জামায়াত) জোট করে, তাহলে এটা কি ঠিক? না, ঠিক না! বলেন নাউজুবিল্লাহ।’
‘আমাদের শাইখের ছেলে, এখন সে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের মাসলাকপরিপন্থি কাজ করবে, সাহাবায়ে কেরামের সাথে বিদ্বেষপোষণকারী যারা, আলেমদের বিদ্বেষপোষণকারী যারা, তাদেরকে শক্তি জোগাবে— এটা ভালো কাজ না অন্যায় কাজ? অন্যায় কাজ। কিন্তু যেহেতু আমার শাইখের ছেলে করছে, তাহলে কি ঠিক আছে?’
‘ঠিক না! সম্পর্ক, যত জাগতিক সম্পর্ক— সবকিছু দুই নম্বরে। হক এক নম্বরে। হককে সব কিছুর ওপর প্রাধান্য দিতে হবে। হককে যদি সম্পর্কের ওপর প্রাধান্য না দিতে পারি, অর্থাৎ ইমানি সম্পর্ককে অন্য সকল সম্পর্ক থেকে ঊর্ধ্বে যদি না রাখতে পারি আমি, তাহলে আমার কীসের ইমান?’
যারা জামায়াতে যোগদান করবে তারা ভ্রান্ত পথে পা বাড়াবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘কী কথা, পুরো কওমি চলে যাবে ওই দিকে (জামায়াতে)! আল্লাহ মাফ করুক, পুরো কওমি যদি ওইদিকে চলে যায়, তবে সব গোমরাহ হয়ে যাবে। আর পুরো কওমি চলে যাবে, এত বেশি স্বপ্ন দেখেন কেন? কওমির কিসমত ভালো থাকলে সে ওইদিকে যাবে না; যার কিসমত খারাপ সে যাবে ওইদিকে।’
