জামায়াত এমপির ইফতারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদককারবারি যুবলীগ নেতা

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৬, ০৯:২৯ পিএম

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জামায়াতের ইফতার মাহফিলে কুখ্যাত মাদককারবারি সেতাবুর রহমান বাবুর উপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তোলপাড়। এ ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সিনিয়র নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) অধ্যাপক মুজিবুর রহমান।

মঞ্চে ঠিক তার পেছনের সারিতেই আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বসে ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত এ অঞ্চলের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী বাবু।

সোমবার (৯ মার্চ) মাটিকাটা আদর্শ কলেজ মাঠে এ ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে মাটিকাটা ইউনিয়ন জামায়াত।

জামায়াতের এ আয়োজনে বাবুর উপস্থিতির ভিডিও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়েছে।

রাজশাহী-১ আসনের ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ফারুক চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী যুবলীগ নেতা বাবুর উপস্থিতিতে জামায়াতের নীতি-নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, সেতাবুর রহমান বাবুর বাড়ি মাটিকাটা ইউনিয়নের (ইউপি) রেলগেট এলাকায়। ওই ইউপির সদস্য ছিলেন বাবু। হেরোইনসহ গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকায় তিনি বরখাস্ত হয়েছেন। বাবু বর্তমানেও যুবলীগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে তার নামে হত্যাসহ একাধিক মামলা হয়েছে। ছিলেন দীর্ঘদিন পলাতক। হঠাৎ তিনি ভোল পাল্টে ডিগবাজি দিয়েছেন। নিজেকে বাঁচাতে জামায়াতের সঙ্গে হয়েছেন ঘনিষ্ঠ।

এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাবু আগে পাওয়ার টিলারের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। ওই সময় হেরোইনের কারবারে জড়িয়ে পড়েন। হয়ে উঠেন বিপুল অর্থবিত্তের মালিক। দুই হাতে টাকা উড়িয়ে পরে মাটিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ইউপি সদস্য থাকা অবস্থায় ২০১৮ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে করা মাদক কারবারিদের এক তালিকায় ৯ নম্বরে সেতাবুর রহমান বাবুর নাম উল্লেখ করা হয়।

ওই প্রতিবেদনে এলাকার তৎকালীন এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীকে মাদকের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজশাহীতে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের একশ্রেণির অসাধু রাজনীতিক মাদক ব্যবসায় জড়িত। তারা ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের ব্যবসা করেন। মাদক ব্যবসা বা চোরাচালান এলাকায় নতুন নতুন মাদকসেবী সৃষ্টি করেছে। এসব মাদকসেবী অর্থের জোগান পেতে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, খুনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।

বাবুর বিরুদ্ধে একাধিক মাদকের মামলা আছে। আওয়ামী লীগের এমপি ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে ছিল তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। বিভিন্ন সময় ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে তিনি ছবি তুলেছেন। বর্তমানেও দায়িত্বে আছেন মাটিকাটা ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সহ-সভাপতি। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন মাটিকাটা এলাকায় ভোট কেন্দ্র দখলে নিতে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে তার নেতৃত্বেই।

সেদিনের ওই হামলায় এলাকার বাসিন্দা জেলা যুবদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম অরণ্য কুসুমের বাবা সাবেক ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম মারা যান। গণঅভ্যুত্থানের পর নিহত নজরুল ইসলামের বড় ছেলে মাসুম সরকার বাদী হয়ে সেতাবুর রহমান বাবুকে প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের আমলে ওই এলাকায় জিয়া পরিষদের কার্যালয়ও দখল করেছিলেন বাবু। এ ঘটনাতেও তার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের পর আরও একটি মামলা হয়েছে।

মাটিকাটা ইউপির সচিব সাব্বির রহমান বলেন, ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে ১০০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যান ৮ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন ইউপি সদস্য সেতাবুর রহমান বাবু। এ কারণে তিনি ইউপি কার্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন। ওই সময় জেলা প্রশাসক স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে বিষয়টি অবহিত করেন। তারপর তাকে ইউপি সদস্যের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। তখন থেকেই তিনি বরখাস্ত অবস্থায় আছেন।

স্থানীয়রা জানান, গণঅভ্যুত্থানের পর গোদাগাড়ী ও রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া থানায় বাবুর বিরুদ্ধে মামলা হলে তিনি আত্মগোপন করেন। হঠাৎ কয়েকদিন আগে তিনি এলাকায় ফিরেছেন। এরপরই তাকে জামায়াতে ইসলামীর অনুষ্ঠানমঞ্চে দেখা গেল। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এলাকার সচেতন ব্যক্তিরা। এতদিন আওয়ামী লীগের এমপি ওমর ফারুকের আশীর্বাদে থাকা এই মাদককারবারি এখন জামায়াতের এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের কাছে ভিড়েছেন বলে তাদের অভিযোগ।

নিহত নজরুল ইসলামের ছেলে রাজশাহী জেলা যুবদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম অরণ্য কুসুম বলেন, আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের দুঃশাসনের সময় এই এলাকার তৎকালীন এমপি ফারুক চৌধুরীর ডান হাত বাবু এলাকায় অনেক অত্যাচার করেছেন। ইসলামের কথা বলে জামায়াত মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। আমরা শুনছি যে জামায়াতের এই ইফতার মাহফিল আয়োজনের পুরো টাকাটাই দিয়েছে মাদককারবারি বাবু।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের এই সন্ত্রাসী ভোট কেন্দ্র দখলে নিতে আমার বাবাকে হত্যা করেছে। তাকেই এখন দেখা যাচ্ছে জামায়াতের মঞ্চে, একেবারে এমপির পাশে। এটা খুব দুঃখজনক। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ঢাকায় গিয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছেন। আর এলাকায় এসে আওয়ামী লীগ ও মাদককারবারিদের পুনর্বাসন করছেন। এলাকার মানুষ হিসেবে আমাদের এর চেয়ে কষ্টের আর কিছু হতে পারে না।

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে মঙ্গলবার বিকালে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সিনিয়র নায়েবে আমির এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমানকে দুবার ফোন করা হয়। তিনি ফোন ধরেননি।

এরপর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মো. কামরুজ্জামানকে ফোন দেওয়া হয়। উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. কামরুজ্জামানের বাড়ি বাবুর এলাকায়।

ইফতার মঞ্চে বাবুর উপস্থিতির বিষয়ে কামরুজ্জামান বলেন, বাবু কিভাবে মঞ্চে এলেন- সেটি বলতে পারব না। এ ব্যাপারে দলের দায়িত্বশীলরাও বলতে পারছেন না। তাকে কেউ দাওয়াত দেয়নি। জেলার একটি কর্মসূচি থাকার কারণে আমি সেখানে বেশিক্ষণ ছিলাম না। আমরা এ ধরনের লোককে প্রশ্রয় দেয় না। তিনি বাঁচার জন্য হয়ত এখানে এসেছেন। আর বাবুর ইফতার মাহফিলের টাকা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমাদের কর্মীরাই টাকার সংস্থান করেছেন। তিনি জামায়াতে যোগ দেননি। বিএনপি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জামায়াতের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করেছে।

গোদাগাড়ী থানার ওসি হাসান বশির বলেন, সেতাবুর রহমান বাবুর নামে কোনো মামলা কিংবা গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে কিনা, সেটি না দেখে বলতে পারব না। পরোয়ানা থাকলে অবশ্যই গ্রেফতার করা হবে। মাদককারবারি হলে কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিলেও তার ছাড় নেই।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন