হেফাজতে ইসলামের আহ্বানে কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামী রাজনৈতিক দলের ঐক্যপ্রক্রিয়ায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ দলগুলোর অবস্থান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সাত দলের মধ্যে বর্তমানে তিনটি দল বিদ্যমান রাজনৈতিক জোটে রয়েছে। এর মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ রয়েছে বিএনপি জোটে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (বিকেএম) ও নেজামে ইসলাম পার্টি রয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে। ঐক্যপ্রক্রিয়ার প্রয়োজনে বিদ্যমান জোট ছাড়ার প্রশ্নে তিন দলের অবস্থান অবশ্য এক নয়। জমিয়ত প্রস্তুতির কথা জানালেও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস আপাতত ১১ দলীয় জোটে থাকার কথা বলেছে। আর নেজামে ইসলাম পার্টি জানিয়েছে, চলমান কর্মসূচির যৌক্তিক পরিণতি না হওয়া পর্যন্ত তারা জোট ছাড়বে না।
গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাজধানীর খিলগাঁওয়ে মাখযানুল উলুম মাদরাসায় সাত দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে ‘সমমনা ইসলামী দল’ নামে অভিন্ন ব্যানারে কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। নতুন কোনো রাজনৈতিক দল গঠন না করে দলগুলো নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রেখে একসঙ্গে কাজ করবে বলে জানানো হয়। পাশাপাশি বিদ্যমান রাজনৈতিক জোটে থাকা দলগুলোর অবস্থান নিয়েও আলোচনা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিএনপি ও জামায়াত জোটে থাকা সংশ্লিষ্ট তিন দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে কালবেলা। তাদের বক্তব্যে কওমি ঘরানার দলগুলোর ঐক্যের বিষয়ে আগ্রহের পাশাপাশি বিদ্যমান জোট নিয়ে ভিন্ন অবস্থান উঠে এসেছে।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি বলেছেন, কওমি ঘরানার দলগুলোর ঐক্যের প্রশ্নে তাদের দল বরাবরই ইতিবাচক। দেশ ও ইসলামের স্বার্থে বৃহত্তর ঐক্যের প্রয়োজনে বিএনপি জোট ছাড়তেও প্রস্তুত জমিয়ত।
কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘জমিয়ত ঐক্যপ্রয়াসী দল। দেশ ও ইসলামের স্বার্থে আমরা সবসময় কওমি ঘরানার দলগুলোর ঐক্যের পক্ষে ছিলাম, এখনো আছি।’
কওমি ঘরানার সাত দলের রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজনে যদি বিএনপি জোট ছাড়তে বলা হয়, তখন জোট ছাড়বেন কি না— এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘সবাই যদি রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে আমরাও প্রস্তুত। আমরা অনেক আগেই আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছি। আমরা বলেছি, সবার প্রয়োজনে, দেশ ও ইসলামের প্রয়োজনে, যদি আরও পরিষ্কার বলি, কওমি ঘরানার দলগুলোর প্রয়োজনে যদি আমরা বিএনপি জোট ছাড়তে হয়, তবে অবশ্যই আমরা প্রস্তুত। আমরা ঐক্য চাই। তবে এখানে যারা থাকবে, সবার সদিচ্ছা প্রয়োজন। জমিয়ত এককভাবে কিছু করতে পারবে না।’
আফেন্দির বক্তব্যে ঐক্যের প্রয়োজনে জোট ছাড়ার প্রস্তুতির কথা উঠে এসেছে। তবে এ ক্ষেত্রে সব দলের সদিচ্ছা ও সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জমিয়ত এককভাবে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারবে না।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেছেন, সাত দলের ঐক্যপ্রক্রিয়া কোন কাঠামোয় এগোবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এটি রাজনৈতিক জোট হবে, নাকি অরাজনৈতিক জোট হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে, সে বিষয়ে পরবর্তী বৈঠকে আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে বর্তমান ১১ দলীয় জোটে থাকার অবস্থানও জানিয়েছেন তিনি।
কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামের আহ্বানে কওমি ঘরানার সাতটি দল দেশ, জাতি এবং ইসলামী বিভিন্ন ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে বলে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু এই পথচলা রাজনৈতিক জোট নাকি অরাজনৈতিক জোট, সেটা এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ডিসেম্বরের বৈঠকে এ নিয়ে কিছু আলাপ হতে পারে।’
কওমি ঘরানার সাত দলের রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজনে যদি জামায়াতের সঙ্গে থাকা জোট ছাড়তে বলা হয়, তখন জোট ছাড়বেন কি না— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো শর্তসাপেক্ষে সাত দলের জোটের পক্ষপাতি না। আমরা এখন পর্যন্ত ১১ দলীয় জোটে আছি এবং যতদিন এই জোটের প্রয়োজন থাকবে, ততদিন আমরা ১১ দলে থাকব ইনশাআল্লাহ।’
জালালুদ্দীনের বক্তব্য অনুযায়ী, সাত দলের ঐক্যপ্রক্রিয়ায় একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হলেও জামায়াত জোট ছাড়ছে না মামুনুল হকের দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস।
নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইজহার জানিয়েছেন, হেফাজতে ইসলামের লিয়াজোঁ কমিটির সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়েছে। তবে এখনই জোট ছাড়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তার বক্তব্যে ১১ দলীয় জোটের চলমান কর্মসূচি এবং জনগণের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে হেফাজতের লিয়াজোঁ কমিটির আলাপ হয়েছে। তবে এখনই জোট ছাড়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘১১ দলীয় জোটটা মূলত নির্বাচনী জোট ছিল। এই নির্বাচনে একটা ভোটের আমরা ফলাফল পেয়েছি, কিন্তু আরেকটার (গণভোট) পাইনি। এখন আমরা জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে, আমরা গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনে আন্দোলন করব। তো ১১ দলের সেই আন্দোলন চলমান। এখন আন্দোলনের মাঝপথে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভেঙে আমরা জোট ছাড়ার কোনো নৈতিকতা নাই। তাই কর্মসূচির একটা যৌক্তিক পরিণতি না হওয়া পর্যন্ত নেজামে ইসলাম ১১ দলের সঙ্গে আছে। আপাতত জোট ছাড়ছি না।’
মুসা বিন ইজহারের বক্তব্যে স্পষ্ট, সাত দলের ঐক্যপ্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চললেও চলমান আন্দোলন ও জনগণের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতির কারণে আপাতত ১১ দলীয় জোট ছাড়ছে না নেজামে ইসলাম পার্টি।
নির্বাচনের আগে-পরে জোট ছাড়ে তিন দল, আগে বেরিয়ে যায় ইসলামী আন্দোলন
কওমি ঘরানার সাত দলের মধ্যে বর্তমানে তিনটি দল বিদ্যমান রাজনৈতিক জোটে রয়েছে। বাকি চার দলের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সম্পর্ক ছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। তবে নির্বাচনের আগে ও পরে দলগুলোর অবস্থানে পরিবর্তন আসে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে ছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তবে আসন সমঝোতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের অল্প কয়েকদিন আগে জোট ছাড়ার ঘোষণা দেয় দলটি।
অন্যদিকে, নির্বাচনের সময় জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে থাকা খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে ঘোষণা দিয়ে জোট ত্যাগ করে। ফলে কওমি ঘরানার সাত দলের মধ্যে বর্তমানে বিএনপি বা জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে থাকা দল তিনটি। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ বিএনপি জোটে রয়েছে। আর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে রয়েছে। এ ছাড়া সাত দলের বাকি সদস্য ইসলামী ঐক্যজোট নির্বাচনের আগে বিএনপি বা জামায়াত নেতৃত্বাধীন দুই জোটের কোনোটিতেই ছিল না। বর্তমানেও তারা এককভাবে কাজ করছে।
অভিন্ন ব্যানারে কার্যক্রম, পরবর্তী বৈঠক ৫ ডিসেম্বর
গত ২২ অক্টোবরের বৈঠকে কওমি ঘরানার সাত দলের নতুন কোনো রাজনৈতিক দল গঠন না করে ‘সমমনা ইসলামী দল’ নামে অভিন্ন ব্যানারে কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। দলগুলো নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রেখেই একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছে। এ ছাড়া আগামী ৫ ডিসেম্বর পরবর্তী বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
তবে ঐক্যপ্রক্রিয়ার রাজনৈতিক কাঠামো এবং বিদ্যমান জোটে থাকা দলগুলোর ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে আলোচনা এখনো বাকি রয়েছে। জমিয়ত ঐক্যের প্রয়োজনে বিএনপি জোট ছাড়তে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস আপাতত ১১ দলীয় জোটে থাকার অবস্থান জানিয়েছে। আর নেজামে ইসলাম পার্টি চলমান কর্মসূচির যৌক্তিক পরিণতি না হওয়া পর্যন্ত জোটে থাকার কথা বলেছে।
ফলে সাত দলের ঐক্যপ্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে এবং বিদ্যমান জোটে থাকা দলগুলোর অবস্থান নিয়ে কী ধরনের সমঝোতা হবে, তা পরবর্তী বৈঠক ও সংশ্লিষ্ট দলগুলোর আলোচনায় স্পষ্ট হতে পারে।
