তাঁতের খটখট শব্দে বোনা হচ্ছে স্বপ্ন

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫২ এএম

খটখট শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে সীমান্তঘেঁষা একটি গ্রামের সকাল-সন্ধ্যা। নীরবতা ভেঙে ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসে তাতের একটানা শব্দ। সূক্ষ্ম সুতো, নকশা আর কারিগরের নিপুণ হাতে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে জামদানির সৌন্দর্য। দূর থেকে দেখলে সাধারণ একটি তাঁতঘর মনে হলেও কাছে গেলে বোঝা যায়- এখানেই বোনা হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী জামদানি শাড়ি। আর সেই শাড়ির প্রতিটি সুতোয় জড়িয়ে আছে কারিগরদের স্বপ্ন, শ্রম ও জীবিকার গল্প।

নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত বাতানিয়াপাড়া গ্রামে এখন প্রতিদিনের চিত্র এমনই। গ্রামের কয়েকটি ঘরে বসেছে তাঁত। সেখানে স্থানীয় কারিগরদের হাতে তৈরি হচ্ছে জামদানি শাড়ি। সূক্ষ্ম সুতোর প্রতিটি টানে যেমন ফুটে উঠছে নকশা, তেমনি ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের নতুন পথ।

বাতানিয়াপাড়ায় সরেজমিনে দেখা যায়, কোনো ঘরের এক পাশে তাঁত বসানো, কোথাও আবার পুরো ঘরটিই যেন ছোট্ট একটি কর্মশালা। একজন তাঁতে বসে শাড়ি বুনছেন। পাশে আরেকজন সহযোগিতা করছেন। কারও হাতে সুতো, কারও চোখ নকশার দিকে। কাজের সময় কথাবার্তা কম; বরং তাঁতের খটখট শব্দই যেন তাদের একমাত্র ভাষা।

কারিগররা জানান, একটি জামদানি শাড়ি তৈরি করা মোটেও সহজ কাজ নয়। একজন কারিগর ও একজন সহকারী মিলে একটি শাড়ি তৈরি করতে সময় লাগে প্রায় এক থেকে দেড় মাস। নকশার জটিলতা ও কাজের ধরন অনুযায়ী সময় আরও বাড়তে পারে। 

কারিগরদের ভাষ্য অনুযায়ী, সবাই মিলে দেড় মাসে প্রায় সাতটি জামদানি শাড়ি তৈরি করতে পারেন। তৈরি করা প্রতিটি শাড়ি পাইকারি দামে প্রকারভেদে বিক্রি হয় প্রায় ৬০-৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ২৮ বছর বয়সী মফিজুল ইসলাম। তিনি বাতানিয়াপাড়া গ্রামের আব্দুল গফুরের ছেলে। মাত্র ১১ বছর বয়সে জামদানি তৈরির কাজ শেখা শুরু করেন তিনি। দেখতে দেখতে কেটে গেছে ১৭ বছর। দীর্ঘ এই সময়ে শুধু নিজেই দক্ষ হয়ে ওঠেননি, অন্যদেরও শিখিয়েছেন জামদানি তৈরির সূক্ষ্ম কারুকাজ।

মফিজুল ইসলামের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত ৮ জন জামদানি তৈরির কাজ শিখেছেন। তার সঙ্গে বর্তমানে স্থানীয় ১৪ যুবক কাজ করছেন। তাদের কারও হাতে বহু বছরের অভিজ্ঞতা, কেউ আবার তুলনামূলক নতুন। তবে সবার লক্ষ্য এক- নিজের এলাকায় থেকেই কাজ করা এবং পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনা।

মফিজুল ইসলাম বলেন, শুরুতে তারা কয়েকজন মিলে এই কাজ শুরু করেছিলেন। ধীরে ধীরে কাজ বেড়েছে। এখন স্থানীয় ১৪ যুবক তার সঙ্গে কাজ করছেন। নিজেদের এলাকায় বসে কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায় আরও যুবক এই পেশায় আগ্রহী হচ্ছেন।

মফিজুলের সঙ্গে কাজ করেন একই গ্রামের যুবক শেখ ফরিদ। পাঁচ বছর ধরে জামদানি তৈরির সঙ্গে যুক্ত তিনি। তবে তার গল্পের একটি আলাদা দিক রয়েছে। কাজটি তিনি শিখেছেন নারায়ণগঞ্জে। শেখার পর সেখানেই থেকে যাওয়ার পরিবর্তে ফিরে এসেছেন নিজের গ্রামে। এখন সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বাতানিয়াপাড়াতেই জামদানি তৈরি করছেন।

শেখ ফরিদ জানান, নারায়ণগঞ্জে কাজ করতে গেলে থাকা-খাওয়াসহ নানা খরচ হতো। নিজের এলাকায় ফিরে আসায় সেই খরচ কমেছে। পরিবারকে সময় দেওয়ার পাশাপাশি কাজও করা যাচ্ছে। নিজের হাতে শেখা কাজ দিয়ে আয় করে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারায় তিনি আনন্দিত।

শেখ ফরিদের মতো আরও অনেকের জন্যই বাতানিয়াপাড়ার তাত এখন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে। বিশেষ করে গ্রামের তরুণদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ প্রত্যন্ত এলাকায় সব সময় কাজের সুযোগ থাকে না। কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের অনেক তরুণের জন্য সারা বছর আয় করার সুযোগও সীমিত।

স্থানীয় কৃষক এমদাদুল ইসলাম বলেন, বাতানিয়াপাড়ায় প্রতিদিনই তাঁতিরা জামদানি তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকেন। তার দাবি, বর্তমানে এলাকায় প্রায় ৫৪ জন এই কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তবে আরও দুই শতাধিক তাঁতি রয়েছেন, যারা কাজের সুযোগের অপেক্ষায় আছেন।

এমদাদুল ইসলামের মতে, জামদানি তৈরির কাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয় বেকার যুবকদের একটি অংশ কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তারা কাজে ব্যস্ত থাকায় মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধ থেকে দূরে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন। একই সঙ্গে পরিবারের আর্থিক চাহিদা মেটাতেও ভূমিকা রাখছেন।

তাঁতিদের দাবি, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহযোগিতা এবং বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা গেলে বাতানিয়াপাড়ার জামদানি শিল্প আরও বড় পরিসরে এগিয়ে যেতে পারে। বর্তমানে যারা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না, তাদেরও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব।

সম্প্রতি বাতানিয়াপাড়ার তাঁতিদের জামদানি শাড়ি তৈরির খবর পেয়ে তাদের কাজ দেখতে পরিদর্শনে যান জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

তিনি তাঁতঘরে গিয়ে জামদানি তৈরির বিভিন্ন ধাপ ঘুরে দেখেন। কথা বলেন কারিগরদের সঙ্গে। তাদের কাজ, উৎপাদন প্রক্রিয়া ও নানা সমস্যার বিষয়ে খোঁজখবর নেন। তাঁতের সামনে দাঁড়িয়ে কারিগরদের কাজও দেখেন তিনি।

পরিদর্শনের সময় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘জামদানি শাড়ি কলমাকান্দা-দুর্গাপুরকে বদলে দিতে পারে। এ শিল্পের উন্নয়ন, তাঁতিদের সহযোগিতা ও এ শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।’

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর