
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৬১তম জন্মদিন ২০ নভেম্বর। ১৯৬৫ সালের এই দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দম্পতির বড় ছেলে তারেক রহমান। তার ডাক নাম পিনু। তবে তিনি তারেক জিয়া নামেই বেশি পরিচিত।
তারেক রহমান সেন্ট জোসেফ কলেজ ও ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল কলেজে পড়াশোনা করে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে আইন বিভাগে ও পরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে উত্তরাধিকারের রাজনীতিতে যেভাবে সাধারণত নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটে তারেক রহমানের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। ইন্দিরার মৃত্যুর পর রাজীব, রাজীবের মৃত্যুতে সোনিয়া, ভুট্টোর মৃত্যুর পর বেনজির, শেখ মুজিবের মৃত্যুতে শেখ হাসিনা বা শহীদ জিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া যখন রাজনীতিতে আসেন তার আগে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য যে প্রস্তুতি দরকার তা নেয়ার সুযোগ তাদের ছিল না। তুলনা করলে আমরা দেখবো তারেক রহমানের প্রস্তুতি ছিল অনেক কঠিন, অনেক ব্যাপক ও অনেক বেশি মাটিঘেঁষা।
তারেক রহমানের জন্মটাই যেন রাজনীতির জন্য। ১৯৮১ সালে যখন দেশধ্বংসের ষড়যন্ত্রকারীদের তপ্ত বুলেট ছিনিয়ে নেয় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রাণ, তখন তারেক রহমান ১৩ বছরের কিশোর। সেদিন তার বুকফাটা কান্নার সঙ্গে গোটা বাংলাদেশের মানুষও কেঁদে বুক ভাসিয়েছিল। সেই শোক এখন তারেক রহমানকে নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের শক্তি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করে মাত্র ২২ বছর বয়সে মা খালেদা জিয়াকে সহযোগিতা করতে গিয়ে রাজনীতিতে হাতেখড়ি দেন তারেক রহমান। ১৯৮৮ সালে জন্মভূমি বগুড়ার গাবতলী থানা বিএনপির একজন সাধারণ সদস্য হিসেবে তার অভিযাত্রা। একেবারে অভিনব রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর কর্মকুশলতায় ক্রমান্বয়ে বগুড়া জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন তিনি।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালে যে পাঁচটি আসনে বিপুলভাবে বিজয়ী হয়েছিলেন সেই আসনগুলোর নিবিড় দেখভালের দায়িত্ব পড়েছিল তারেক রহমানের উপর। কারণ বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্যস্ত থাকতেন। তবে তার বিশেষ নজর ছিল ওই ৫ আসনের জনগণের প্রতি।
তারেক রহমান সেসব আসনের দায়িত্ব নিয়ে উন্নয়ন এবং সমাজকল্যাণে মনোযোগ দেন। একইসঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গন হিসেবে বেছে নেন উত্তরের প্রাণকেন্দ্র বগুড়াকে।
এরপর বিএনপির জন্য শুধু নয় দেশে সক্রিয় সব রাজনৈতিক দলের সামনে এক চমকপ্রদ সাংগঠনিক মডেল হয়ে ওঠে বগুড়া। বগুড়ায় তিনি বিএনপিসহ সব অঙ্গদলের ভেতর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থাপন করেন নতুন এক মাত্রায়। তারেক রহমানের এমন অনন্য সাধারণ রাজনৈতিক জোতির্ময়তা আর দক্ষতায় দলের সিনিয়র নেতারা তার প্রতি নির্ভরতা এবং সম্পূর্ণ আস্থা স্থাপন করেন।
২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি নেপথ্যে থেকে বিশাল সর্বব্যাপী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৯ সালে ঢাকা মহানগরীর খানিকটা কোলাহল মুক্ত পরিবেশের বনানীতে বিএনপির জন্য একটি অফিস নেন। যেখানে নিভৃতে বসে চলমান রাজনৈতিক তথ্যপুঞ্জ নিয়ে গবেষণা, সারাদেশের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সক্রিয় সংযোগ স্থাপন করা, নির্বাচন এবং সাংগঠনিক কর্মকৌশলকে বাস্তবে প্রয়োগ ঘটান।
বিশ্বের সুসংগঠিত প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দলের আদলে সেই অফিস অচিরে হয়ে ওঠে বিএনপির সাংগঠনিক প্রাণকেন্দ্রে। আর ওদিকে রাজধানীর কেন্দ্রস্থলের ব্যস্ততম এলাকা নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে থাকে। তারেক রহমানের পরিকল্পিত কর্মকৌশল এবং দলের সিনিয়র নেতাদের প্রচেষ্টায় ২০০১ সালের নির্বাচনে চার দলীয় জোট ব্যপক জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। উল্লেখ্য, চার দলীয় জোট গঠনে তারেক রহমানের ভূমিকা ছিল ব্যাপক।
জনগণ চারদলীয় জোটকে ২০০১-এ সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার পর বিএনপির সিনিয়র এবং দায়িত্বশীল নেতারা সরকারি দায়িত্বে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে দলের কর্মকাণ্ডে পড়ে ভাটা। দল সরকারে একাকার হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। চিন্তিত হয়ে পড়েন সিনিয়র নেতারা। এ অবস্থায় ২০০২ সালের ২২ জুন বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম একজন পরিণত বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ হিসেবে তারেক রহমানকে বাছাই করেন এবং দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব হিসেবে মনোনয়ন দেন।
দায়িত্ব লাভের পর তারেক রহমান দলের হাইকমান্ড এবং সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করেই বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল বিএনপিকে তৃণমূল শক্তিতে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়ে সূচনা ঘটান অভিযাত্রার। কেন্দ্র থেকে প্রায় ৭০ হাজার গ্রাম অবধি বিস্তীর্ণ একটি দল। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে ছিল পরিচর্যাহীন ছত্রভঙ্গ হয়ে সেই দলকে সুসংগঠিত করাটা অসাধ্য সাধনের জেহাদের মত। তাই তারেক রহমান তার গহীনে অমিত তেজ নিয়ে পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পদাংক অনুসরণে নামেন।
প্রথমেই বিএনপির বিভাগীয় সম্মেলনের আয়োজন করেন ঢাকায়। তাদের মুক্তকণ্ঠ মতামতকে সরকারের হাতে তুলে দেন বাস্তবে প্রয়োগের জন্য। আর তিনি পরখ করে নেন সংগঠনের দুর্বলতার চিত্রগুলো। এরপর সামনে অগ্রসর হওয়ার পালা। দলের প্রতিটি ইউনিয়ন, থানা, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয় দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশনায়। সারাদেশে সংগঠনে ফিরে আসে অবিশ্বাস্য চাঞ্চল্য। যেন এক উৎসবের আমেজ।
কেবল বিএনপি নয়, বন্ধ্যাত্ব ঘুচিয়ে পুনর্গঠন করেন বিএনপির নিয়ামক যুবদলকে। ছাত্রদলকে নিজের করতলে রেখে গতানুগতিক ফরমেট চূর্ণ করে দিয়ে নতুন ধাঁচে গড়ে তোলেন। অভিভাবক এবং সচেতন মহল বিশেষ করে মেধাবী শিক্ষার্থীদের সামনে যে ছাত্র সংগঠন ছিল ভীতিকর এবং বখে যাওয়াদের অধিকারে, সেই ছাত্র সংগঠনের প্রতি ফিরে আসে এক অহিংস মুগ্ধতা।
তারেক রহমান ছাত্রদলকে রাজনীতির পাঠকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। শিক্ষাঙ্গন পায় সন্ত্রাসমুক্তির বাতায়ন। তিনি ঢাকা ছেড়ে সংগঠন আর মানুষের টানে বেরিয়ে পড়েন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন এক কর্মসূচি উৎকীর্ণ করে গ্রাম- গ্রামান্তরে। ইউনিয়ন প্রতিনিধি সভার আবরণে নিজেকে হাজির করেন তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মাঝে।
দেশের গুরুত্বপূর্ণ ২৩টি জেলায় লক্ষাধিক ইউনিয়ন প্রতিনিধি তিন মাস ধরে যেন স্বতঃস্ফূর্ত উৎসব করেছেন। প্রান্তিক স্তরের মানুষগুলো মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁদের মনের কথা বলেছেন অকপটে। আর বয়স্করা, তাঁরা যেন চাক্ষুস শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে কাছে পেয়েছিলেন। জিয়াউর রহমানের প্রতিচ্ছবিকে এমন কাছে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন বেশুমার মানুষ। অনেকে তাকে এক পলক দেখার অতলস্পর্শী সুখ আর ছুঁয়ে দেয়ার অভাবনীয় আনন্দ যেন জীবনের পরমপ্রাপ্তি বলে মনে করে ঘরে ফেরেন।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সবচেয়ে মেধাবী অসামান্য প্রজ্ঞা, কর্মবীরত্ব আর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন নেতার নাম তারেক রহমান। ধাবমান ধরিত্রির বুকে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে উন্নয়নের এক আশ্চর্য শেখরে টেনে তোলার স্বপ্ন সংগ্রাম যার ধমনীতে অষ্ট্রপ্রহর জুড়ে, যার ধ্যান-জ্ঞান পরিকল্পনার পথ-নকশা একটি জাতিকে নিয়ে।
তারেক রহমান এখন আর কেবল একজন ব্যক্তি মানুষ নন। তিনি পিছিয়ে পড়া মানুষের ভাগ্য বদলের এবং আগামী স্বনির্ভর উন্নত বাংলাদেশের এক দার্শনিক। জাতির কাণ্ডারী। একটি স্বপ্ন, একটি দুর্বিনীত প্রত্যয়, ঘটে যাওয়া বিপ্লবের সুনিশ্চিত মহানায়ক।
তার অসামান্য রূপকথার মত জনপ্রিয়তা, তার হাতে ভাগ্য বদলের চাবি তুলে দেয়ার নিশ্চিন্ত গণঅপেক্ষা তার শত্রুদের ঘুম ছিনিয়ে অস্থির করে তুলেছে। তারা এমন ক্ষণজন্মা নেতাকে সইতে পারছে না। তারা বুঝে গেছে, তারেক রহমানকে আর পরাজিত করা যাবে না। তাই সংঘবদ্ধ এবং বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়েছে সবখানে।
লেখক: সদস্য সচিব, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদল

