বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘ সময় ধরে এক ক্লান্ত, আস্থাহীন ও সংকটপূর্ণ অধ্যায় অতিক্রম করছে। প্রায় দেড় দশকের বেশি সময় ধরে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি, ভোটাধিকারের প্রশ্নবিদ্ধতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, নাগরিক স্বাধীনতার সংকোচন এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ক্রমবর্ধমান দলীয়করণ রাষ্ট্রের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। এই বাস্তবতায় ১৭ বছর পর একটি অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাবনা এবং ১৮ বছর পর তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনাই নয় এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জীবনে একটি সম্ভাব্য রূপবদলের মুহূর্ত।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো তারেক রহমানকে আমরা কীভাবে দেখব? একজন প্রচলিত দলীয় রাজনীতিক হিসেবে, নাকি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতবিক্ষত ও বিভক্ত রাষ্ট্রকে নতুন করে দাঁড় করানোর দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত একজন রাষ্ট্রনায়ক-ইন-দ্য-মেকিং হিসেবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে আটকে থাকলে চলবে না; বরং তার বক্তব্য, আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।
১৮ বছর পর দেশে ফিরে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ভাষণটি ছিল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় ব্যতিক্রমী। দীর্ঘ নির্বাসন, মামলা, দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক বঞ্চনার অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তার বক্তব্যে ছিল না বিদ্বেষ, ছিল না প্রতিশোধের ভাষা। বরং তার ভাষণের মূল সুর ছিল জাতীয় ঐক্য, দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণ। তিনি কারও নাম ধরে আক্রমণ করেননি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু বানাননি। তার আহ্বান ছিল বিভক্ত সমাজকে পুনরায় সংহত করার যা বর্তমান বাংলাদেশের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়।
তার বক্তব্যে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়নি বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে; বরং নৈতিকতা ও মানবিক রাষ্ট্রচর্চার ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। নবীজি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দেখানো পথে রাষ্ট্র পরিচালনার কথা বলে তিনি ন্যায়বিচার, সহনশীলতা, দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতার মূল্যবোধ সামনে আনেন। এটি কোনো ধর্মীয় শাসনের আহ্বান নয়; বরং একটি নৈতিক রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন, যা ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য এবং বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
তারেক রহমানের ভাষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিকল্পনাভিত্তিক রাজনীতির স্পষ্ট ঘোষণা। মার্টিন লুথার কিংয়ের ঐতিহাসিক উচ্চারণের অনুপ্রেরণায় তার বক্তব্য-“I have a plan, we have a plan for the people, for the country” এই বাক্যটি আবেগী স্লোগানের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে দায়িত্বশীল ও নকশাভিত্তিক নেতৃত্বের কথা বলে। এখানে স্বপ্ন আছে, তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের স্পষ্ট দিকনির্দেশনাও আছে।
স্বাস্থ্য খাতে আমূল সংস্কার, সবার জন্য ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালু এসব প্রস্তাব রাষ্ট্রের প্রান্তিক ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর প্রতি একটি দায়বদ্ধ রাষ্ট্রদর্শনের পরিচায়ক। ইমাম ও হুজুরদের জন্য সম্মানজনক ভাতা প্রদানের কথা বলে তিনি সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে সম্মান জানান। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন, পরিবেশ সংরক্ষণে টেকসই কার্যক্রম এবং দুর্নীতি দমনে কঠোর ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় রোডম্যাপের ইঙ্গিত দেন।
এই রাষ্ট্রীয় রোডম্যাপের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তরুণ সমাজ। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রশ্নটি মূলত তরুণদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের প্রশ্ন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় তরুণরা বেকারত্ব, মানহীন শিক্ষা, দক্ষতার অভাব এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভারে চাপা পড়ছে। তারেক রহমানের বক্তব্যে তরুণদের কেবল ভোটার হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র নির্মাণের অংশীদার হিসেবে দেখার প্রত্যয় স্পষ্ট। দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা বিকাশ এবং ভয়মুক্ত মতপ্রকাশ এসবই নতুন বাংলাদেশের মৌলিক উপাদান।
রাষ্ট্রনায়কত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা। তারেক রহমান তার বিরুদ্ধে থাকা সমালোচনাকে স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া, প্রতিশোধের ভাষা কিংবা দমনমূলক মনোভাব তার আচরণে লক্ষ্য করা যায়নি। তিনি ভিন্নমতকে গণতন্ত্রের দুর্বলতা হিসেবে নয়, বরং শক্তি হিসেবে দেখার মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। বহুমাত্রিক সমাজে দমন নয়, সংলাপ ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থাপনাই স্থিতিশীল রাষ্ট্রের ভিত্তি এই উপলব্ধিই পরিণত নেতৃত্বের লক্ষণ।
ভাষণের বাইরেও তার সাম্প্রতিক আচরণ এই বার্তাকে আরও শক্তিশালী করে। তিনি কেবল দলীয় বৃত্তের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং শ্রমজীবী, পেশাজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, তরুণ ও প্রবীণ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে দেখা করছেন, কথা শুনছেন। এটি ক্ষমতা প্রদর্শনের রাজনীতি নয়; এটি আস্থা তৈরির রাজনীতি।
এখানেই একজন সাধারণ রাজনীতিক ও একজন রাষ্ট্রনায়কের পার্থক্য স্পষ্ট হয়। ভিড়ের নেতা জনপ্রিয়তার ঢেউয়ের ওপর ভর করে এগিয়ে যান, কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক আস্থার ভিত গড়ে তোলেন। জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু আস্থা রাষ্ট্র নির্মাণের স্থায়ী মূলধন।
এই জাতীয় নির্বাচনে কে জিতবে বা কে হারবে তা সময়ই নির্ধারণ করবে। কিন্তু ইতিহাস শুধু বিজয়ীর নাম লিপিবদ্ধ করে না; সে বিচার করে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও রাষ্ট্রচিন্তার গভীরতাও। যদি ১৮ বছর পর তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রতিহিংসা ও বিভাজনের পথ থেকে পরিকল্পনা, ঐক্য এবং পুনর্গঠনের পথে এক ধাপ এগিয়ে নিতে পারে, তবে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় অর্জন।
“করবো কাজ, গড়বো দেশ; সবার আগে বাংলাদেশ।“এই বাক্য কেবল স্লোগান নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিতে রূপ নেবে ইনশাল্লাহ, তবে ই একজন রাজনীতিকের যাত্রা সত্যিকার অর্থেই একজন রাষ্ট্রনায়ক-ইন-দ্য-মেকিং-এর পরিচয়ে রূপ নিতে পারবে।
ডাঃ এ, কে, এম আহসান হাবীব নাফি
চিকিৎসক ও রাজনৈতিক কর্মী