তেলের রাজনীতি ও ভেনেজুয়েলা; মার্কিন আগ্রাসন, চীন-রাশিয়ার নীরবতা
মোঃ রাকিবুল ইসলাম, ক্যাম্পাস প্রতিনিধি(ডুয়েট)
জেরুজালেম পৃথিবীর ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এবং আব্রাহামিক ধর্মমতের জন্য পবিত্রস্থান।১৯৪৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘাত ও যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। পশ্চিমা শক্তিগুলো, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশসমূহ, পরিকল্পিতভাবে পুচকে ইসরাইলকে সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়ে আসছে। এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ও জ্বালানি সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ।।
এই প্রেক্ষাপটে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর আন্তর্জাতিক ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬০ সালে ভেনিজুয়েলা সহ পাঁচটি দেশ ভেনেজুয়েলা, সৌদি আরব, ইরান, ইরাক ও কুয়েত একত্রিত হয়ে OPEC গঠন করে, যার উদ্দেশ্য ছিল তেলের দাম ও উৎপাদনের ওপর উৎপাদক দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং পশ্চিমা বহুজাতিক তেল কোম্পানি ও শক্তিধর দেশগুলোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে উৎপাদকদের স্বার্থ রক্ষা করা। OPEC-এর সদর দপ্তর শুরুতে জেনেভা (সুইজারল্যান্ড) ছিল, পরে ভিয়েনা (অস্ট্রিয়া) তে স্থানান্তরিত হয় এবং বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ১৩টি দেশ। OPEC তেলসম্পদ নিয়ে উৎপাদক দেশগুলোর সমন্বিত নীতি নির্ধারণে আন্তর্জাতিক শক্তি রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্বে ভেনিজুয়েলা সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুদকারী দেশ, যার প্রমাণিত তেলের মজুদ প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল এবং এটি বিশ্ব মজুদের প্রায় ১৭–১৮% ধারণ করে, যা সৌদি আরব (২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেল) ও ইরানের (২০৯ বিলিয়ন ব্যারেল) চেয়েও বেশি। অন্য বড় তেল মজুদকারী দেশগুলোর মধ্যে কানাডা (১৬৩–১৬৮ বিলিয়ন), ইরাক (১৪৫ বিলিয়ন), UAE (১১৩ বিলিয়ন) ও কুয়েত (১০১-১০২ বিলিয়ন) রয়েছে।
যদিও ভেনেজুয়েলার তেলের মজুদ বিশাল, উৎপাদন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অবকাঠামোর ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে কম সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উৎপাদন বিশ্বব্যাপী মোট আউটপুটের মাত্র ছোট অংশ মাত্র।
ভেনেজুয়েলায় কেন মার্কিন আগ্রাসন
হুগো শ্যাভেজের উত্তরসূরী হিসেবে ২০১৩ সালের এপ্রিলে নিকোলাস মাদুরো অল্প ভোটের ব্যবধানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর দ্বিতীয় মেয়াদে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতায় আসেন। ২০১৮ সালের মে মাসে তার প্রায় ৬৮% ভোট পাওয়ার দাবি করা হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তিনি টানা তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হন।২০১৪ সাল থেকে মাদুরোর শাসনামলে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি চরম সংকটে পড়ে। মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করেছে। IOM এর মতে প্রায় ২০%মানুষ দেশ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।২০১৭ সালে তিনি একটি জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদ গঠন করেন সংবিধান সংশোধনের জন্য, যা দেশজুড়ে বিতর্ক ও বিক্ষোভের সৃষ্টি করে। মাদুরো বিরোধীদের কঠোর হাতে দমন করেছেন এবং কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন।যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও তেলবাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
সিঙ্গাপুরের উপকূলে নিয়মিত দেখা যায় এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে তেলের স্থানান্তর। অনেক সময় এটি স্বাভাবিক হলেও, কিছু ক্ষেত্রে বিতর্কিত হয়ে ওঠে। কারণ, সিঙ্গাপুর বন্দর কতৃপক্ষের নির্দিষ্ট সীমানা আছে। এই সীমার ভিতরে প্রবেশ করলে চার্জ দিতে হয়। তাই অনেক জাহাজ বন্দর এলাকার বাইরে অপেক্ষা করে, যেখানে মালয়েশিয়া আইন শিথিলভাবে প্রয়োগ করে। এটি একটি নিয়ন্ত্রণহীন সীমানা, যা ব্যবহার করে ডার্ক ফ্লিট বা অদৃশ্যভাবে তেল পরিবহন করা হয়।
বিশ্বের তেলের ব্যবসা প্রধানত দুই ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে চলে।প্রায় ৯০ ভাগ পশ্চিমা দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন। এখানে তেলের কোন জাহাজে ওঠবে, কোন বন্দরে খালাস হবে, ব্যাংকিং ও বীমার সব ব্যবস্থা কড়া নজরে থাকে। ফলে, যদি কোনো দেশ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে, তাদের তেল পরিবহন, বীমা বা খালাস কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
দ্বিতীয়টি চীনের নিয়ন্ত্রণাধীন। চীনা কোম্পানি পুরাতন জাহাজ কিনে ভেনেজুয়েলা, রাশিয়া ও ইরান থেকে তেল আনে, নিয়ন্ত্রিত এলাকা বা গ্রে জোনে অপেক্ষা করায় এবং জাহাজের ট্র্যাকিং বন্ধ রাখে। এই তেল পরে মালয়েশিয়ার তেলের সঙ্গে মিশিয়ে বৈধ দেখানো হয়, তারপর চীনের ছোট রিফাইনারিতে শোধন করা হয়। পেমেন্ট সাধারণত চীনা মুদ্রায় হয়।
এই ব্যবস্থা আমেরিকার জন্য বড় হুমকি। এতে ডলারের প্রাধান্য কমছে এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে না। বিশ্বের প্রধান তেল উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়া, ভেনেজুয়েলা ও ইরান এই চীনা সিস্টেমের অংশ।
তবে এই তিন দেশের মধ্যে কৌশলগত লক্ষ্য ও সহজলভ্যতা ভিন্ন।পরাশক্তি রাশিয়ার সাথে ইউক্রেনে আমেরিকার প্রক্সিযুদ্ধ চলতেছে। ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী, জনগণের সমর্থন আছে এবং আগেও আক্রমণ বা বাধা দিয়ে সুবিধা নেওয়া সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলা বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল মজুদের দেশ হলেও প্রতিরক্ষা দুর্বল, সরকার স্বৈরাচারী এবং আমেরিকার নিকটে অবস্থান করে। আফগানিস্তানের দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে আর যেতে চাইছে না, তাই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে তেলের সম্পদে প্রভাব রাখা সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য।
ফলে, আন্তর্জাতিক সংঘাত, তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের কেন্দ্রবিন্দুতে ভেনেজুয়েলা ও চীন-আমেরিকা দ্বন্দ্ব রয়েছে। সিঙ্গাপুরের উপকূল, নিয়ন্ত্রণহীন সীমানা, ডার্ক ফ্লিট এবং চীনা জাহাজ কৌশল এই সম্পূর্ণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমেরিকার ভেনেজুয়েলায় চালানো আগ্রাসন চীন এবং রাশিয়ার বিধাল কূটনৈতিক পরাজয়।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার মধ্যে চীন ও রাশিয়া সরাসরি সামরিক সহায়তা দেয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ নীরবতার মূল কারণ হলো ভেনেজুয়েলার দূরত্ব, অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং উভয় দেশের জন্য বড় ঝুঁকি।
চীন ও রাশিয়ার দক্ষিণ আমেরিকায় কোনো স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি নেই, এবং মার্কিন সামরিক শক্তির তুলনায় ভেনেজুয়েলার সীমিত সামর্থ্য সরাসরি হস্তক্ষেপকে কঠিন করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই দেশই মিত্রদের সাহায্য করতে পারে, কিন্তু নিজেদের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থকে বিপন্ন করতে চায় না।
বর্তমানে ভেনেজুয়েলার একমাত্র কার্যকর বিকল্প হিসেবে ধরা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী অপ্রতিসম যুদ্ধ, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও বড় ধরনের আক্রমণ চালাচ্ছে না, তাই আপাতত পরিস্থিতি স্থিতিশীল।
