নীলফামারীর ডিমলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন একটি সড়ক সংস্কারকাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। আগে সড়কে বিছানো নিম্নমানের খোয়া অপসারণ করে দরপত্রের শিডিউল অনুযায়ী মানসম্মত উপকরণ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হলেও তা সরানো হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বরং ওই খোয়ার ওপর নামমাত্র রোলার চালিয়ে প্রাইম কোট দেওয়ার পর কার্পেটিং করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ডিমলার বাবুরহাট জিসি-ডালিয়া আরঅ্যান্ডএইচ সড়ক ভায়া শুটিবাড়ি সড়কের সংস্কারকাজ নিয়ে এর আগেও একাধিকবার অভিযোগ ওঠে। গত ২৯ জুন ‘আড়াই কোটি টাকার সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সড়কে নিম্নমানের খোয়া, রাবিশ ও ভাঙা ইট ব্যবহারের অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
এর পরদিন ৩০ জুন সড়কটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান, জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী শিশির চন্দ্র দাস, উপজেলা প্রকৌশলী মফিজুর রহমান, তৎকালীন উপসহকারী প্রকৌশলী শরীফ মো. জিকরুল আমিন পাটোয়ারী এবং ঠিকাদার সাদ্দাম হোসেনসহ সংশ্লিষ্টরা। পরিদর্শনের সময় সড়কে বিছানো খোয়া নিম্নমানের বলে প্রতীয়মান হলে তা অপসারণ করে মানসম্মত উপকরণ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর আগে ২৫ জুন ডিমলা উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া চিঠিতেও নিম্নমানের খোয়া অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। চিঠিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট উপসহকারী প্রকৌশলী সাইট পরিদর্শনকালে স্পেসিফিকেশনবহির্ভূত নিম্নমানের ডব্লিউবিএম খোয়া মজুদের বিষয়টি দেখতে পান। ওই খোয়া সাইট থেকে অপসারণ করে স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী খোয়া মজুদ করে কাজ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনা না মানার কারণে বিল প্রদানে কোনো জটিলতা হলে তার দায় ঠিকাদারকে বহন করতে হবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
পরে ৩ আগস্ট কালবেলায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, লিখিত নির্দেশের পরও সড়কে বিছানো নিম্নমানের ইটের খোয়া অপসারণ করা হয়নি এবং সংস্কারকাজ বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক মাস বন্ধ থাকার পর গত সপ্তাহে আবার কাজ শুরু হয়েছে। তবে সড়কে আগে বিছানো নিম্নমানের খোয়া কিংবা সড়কের পাশে মজুদ থাকা খোয়া অপসারণ করা হয়নি। বরং পুরোনো খোয়ার ওপর নামমাত্র রোলার চালিয়ে প্রাইম কোট দেওয়া হচ্ছে। এরপর ওই স্তরের ওপর কার্পেটিং করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।
কার্পেটিংয়ের জন্য বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানি করা এলসি পাথর আনা হয়েছে বলেও জানান স্থানীয়রা। তাদের দাবি, এসব পাথরের প্রায় ৩০ শতাংশ ‘মরা পাথর’, যা কার্পেটিংয়ের কাজে ব্যবহারের অনুপযোগী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আগের বিছানো খোয়ার ওপরই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে এমন কোনো তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন অংশে আগে বিছানো খোয়া রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব খোয়ার মান নিয়ে আগেই অভিযোগ ওঠার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিদর্শন করে তা অপসারণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরপরও ওই খোয়া না সরিয়ে তার ওপর নতুন করে কাজ করায় সড়কের স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
এ ছাড়া সড়কের ওপর থাকা ধুলাবালি, ময়লা ও মাটি যথাযথভাবে পরিষ্কার না করেই প্রাইম কোট দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইটের খোয়া ও বালুর মিশ্রণ যথাযথভাবে রোলার না করা এবং রোলার চালানোর সময় প্রয়োজনীয় পানি ব্যবহার না করার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। সড়কের দুই পাশের এজিংয়েও শিডিউল অনুযায়ী উপকরণ ব্যবহার করা হয়নি বলে দাবি তাদের।
মকবুল মাস্টারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হরি কিশোর চন্দ্র রায় বলেন, ‘রাস্তায় যে পচা ও নিম্নমানের খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে, তা দেখলেই বোঝা যায়। গরু নিয়ে যাওয়ার সময় গরুর পায়ের নিচে পড়া খোয়াও ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। এই খোয়ার ওপর রাস্তা করলে কতদিন টিকবে, সেটাই আমাদের প্রশ্ন।’
কলোনীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল খলিল বলেন, ‘যে খোয়া নিম্নমানের বলে আগে কর্মকর্তারা সরিয়ে ফেলতে বলেছেন, সেটি না সরিয়েই আবার কাজ করা হচ্ছে। পুরোনো খোয়ার ওপর রোলার দিয়ে তার ওপর প্রাইম কোট দেওয়া হচ্ছে। এভাবে কাজ হলে জনগণের টাকার সঠিক ব্যবহার হবে কি না, সেটি কর্তৃপক্ষের দেখা উচিত।’
সাকালু মাস্টারপাড়া গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুল জব্বার বলেন, ‘আমরা চাই রাস্তাটি ভালোভাবে নির্মাণ হোক এবং দীর্ঘদিন টিকে থাকুক। কিন্তু এখানে ইট ও বালুর মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। আগে নিম্নমানের খোয়া নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর কর্মকর্তারা পরিদর্শনও করেছেন। এরপরও সেই খোয়া না সরিয়ে কাজ করা হলে ভবিষ্যতে রাস্তা দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা মোতালেব হোসেন বলেন, ‘আগে নিম্নমানের খোয়া নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর কর্মকর্তারা সরেজমিনে এসে তা অপসারণের নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ সেই খোয়া না সরিয়েই আবার কাজ চলছে। জনগণের টাকায় নির্মাণকাজে যদি নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়, তাহলে এর দায় কে নেবে? আমরা চাই, কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে শিডিউল অনুযায়ী মানসম্মতভাবে রাস্তার কাজ শেষ করুক।’
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গ্রামীণ সড়ক মেরামত ও সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় সময়ান্তর রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পের অধীনে বাবুরহাট জিসি-ডালিয়া আরঅ্যান্ডএইচ সড়ক ভায়া শুটিবাড়ি সড়কের সংস্কারকাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রকল্পটির প্রাক্কলিত মূল্য ২ কোটি ২৪ লাখ ৯৬ হাজার ৩১৫ টাকা। চুক্তিমূল্য ২ কোটি ১৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৯ টাকা। নীলফামারী সদর উপজেলার মসজিদপাড়া এলাকার মেসার্স সিদ্দি ইঞ্জিনিয়ারিং মার্কসের স্বত্বাধিকারী মোছা. তাসলিমা আক্তার সুখীকে কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কাজটি দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছেন তার স্বামী মাহফুজার রহমান সাদ্দাম হোসেন।
মাহফুজার রহমান সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘সিডিউল মোতাবেক কাজ করছি। অফিস শতভাগ কাজ বুঝে নিচ্ছে।’
কাজের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী প্রকৌশলী বজলুর রহমান বলেন, ‘লিখিতভাবে কাজ দেখাশোনার দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়নি। অফিস থেকে যেতে বলে, তাই যাই।’
এলজিইডির নীলফামারীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শামিম আখতার বলেন, ‘সড়কের কাজ সিডিউল অনুযায়ী হচ্ছে। তবে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’
