পদ্মায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে আবারও ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। তীব্র স্রোতের আঘাতে প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটাসহ নদীতীরবর্তী বিভিন্ন স্থাপনা। কোথাও কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নদীর পাড় ভেঙে পড়ছে, আবার কোথাও নতুন করে দেখা দিয়েছে ভাঙনের ফাটল। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পদ্মা নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে।
এক সপ্তাহ ধরে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে গোয়ালন্দ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভাঙন দেখা দিয়েছে দেবগ্রাম ইউনিয়নের মুন্সিবাজার এলাকায়। পাশাপাশি দৌলতদিয়া ইউনিয়নের লালু মন্ডল পাড়া, ১ নম্বর বেপারী পাড়া, নতুন পাড়া ও শাহ বেপারী পাড়া এলাকাতেও রয়েছে ভাঙনের তীব্র ঝুঁকি।
এরই মধ্যে নদীর পাড়ের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে বসতভিটা, মসজিদ, ঈদগাহ, কবরস্থান, হাটবাজার, বিদ্যালয় ও রাস্তাঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা স্থাপনা।
নদীপাড়ের বাসিন্দাদের চোখেমুখে এখন আতঙ্ক। দিনের বেলায় নদীর পাড়ে ভাঙন দেখলেও রাত নামলেই বাড়ে দুশ্চিন্তা। কখন বসতভিটা কিংবা জমি নদীগর্ভে চলে যায়- এই শঙ্কায় অনেকেই নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।
স্থানীয়দের দাবি, ভাঙন স্থায়ীভাবে বন্ধে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে অল্প সময়ের মধ্যেই আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।
পদ্মার বুকজুড়ে তীব্র স্রোত। স্রোতের সঙ্গে পাড়ে আছড়ে পড়ছে পানির ঢেউ। আর সেই আঘাতেই কোথাও কোথাও হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ছে নদীর পাড়। চোখের সামনে নিজের জমি নদীতে বিলীন হতে দেখে অসহায় হয়ে পড়ছেন স্থানীয়রা।
দেবগ্রাম ইউনিয়নের মুন্সিবাজার এলাকায় বর্তমানে ভাঙনের তীব্রতা বেশি। প্রতিদিনই নতুন নতুন জায়গায় ভাঙন দেখা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ফসলি জমির পাশাপাশি নদীতীরবর্তী স্থাপনা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভাঙন কবলিত স্থানীয়দের ভাষ্য, পদ্মার পানি বাড়লেই ভাঙন নতুন করে শুরু হয়। ভাঙন ঠেকাতে বিভিন্ন সময়ে জিওব্যাগসহ নানা ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন না হওয়ায় স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। ফলে এক বছর ভাঙন ঠেকানো গেলেও পরবর্তী বর্ষায় নতুন কোনো এলাকায় দেখা দিচ্ছে ভাঙন।
ঝুঁকিতে বসতভিটা, মসজিদ-কবরস্থানসহ স্থাপনা
শুধু মুন্সিবাজার নয়, দৌলতদিয়া ইউনিয়নের লালু মন্ডল পাড়া, ১ নম্বর বেপারী পাড়া, নতুন পাড়া ও শাহ বেপারী পাড়া এলাকাতেও ভাঙন ও ভাঙনের ঝুঁকি রয়েছে।
এসব এলাকায় নদীর কাছাকাছি রয়েছে মানুষের বসতভিটা ও কৃষিজমি। কোথাও মসজিদ, কোথাও ঈদগাহ ও কবরস্থান; আবার কোথাও রয়েছে হাটবাজার, বিদ্যালয় ও স্থানীয় সড়ক। ভাঙনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় এসব স্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন শুরু হওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা অনেক সময় ভাঙন ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট হয় না। নদীর গতিপথ ও স্রোতের চাপ বিবেচনায় নিয়ে স্থায়ী নদীশাসন করা না হলে প্রতি বছরই একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হবে।
তাদের দাবি, শুধু ভাঙন শুরু হওয়ার পর জিওব্যাগ ফেলা নয়, নদীর গতিপথ ও স্রোত নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে স্থায়ী ভাঙনরোধের কাজ করতে হবে।
পানি বিপদসীমার নিচে!
রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি সমতল ৭ দশমিক ২০ মিটার। এ পয়েন্টে বিপদসীমা ৮ দশমিক ২০ মিটার। অর্থাৎ নদীর পানি এখনো বিপদসীমার ১ মিটার নিচে রয়েছে।
তবে পানি বিপদসীমার নিচে থাকলেও পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নদীভাঙনের তীব্রতা বাড়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, সামনে নদীর পানি আরও বাড়লে ভাঙনের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ডও জানিয়েছে, নদীর পানি বৃদ্ধি ও ভাঙন পরিস্থিতি তারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে। ৩০ টি স্থানে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বিভাগ কর্তৃপক্ষ।
স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষায় নদীপাড়ের মানুষ
পদ্মায় পানি এখনো বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। কিন্তু পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যেভাবে নদীর পাড় ভাঙছে, তাতে আতঙ্ক বাড়ছে নদীপাড়ের মানুষের।
একদিকে নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে মানুষের ফসলি জমি, অন্যদিকে চোখ রাঙাচ্ছে বসতভিটা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। বছরের পর বছর নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা মানুষগুলো এবারও তাকিয়ে আছেন প্রশাসনের দিকে।
নদীপাড়ের বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, ভাঙন তীব্র হওয়ার পর সাময়িক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নয়, পদ্মার গতিপথ, স্রোত ও ভাঙনপ্রবণ এলাকা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর নদীশাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কারণ, পদ্মার পাড়ে বসবাসকারী মানুষের কাছে নদী শুধু জীবিকা ও জীবনের অংশ নয়, একই সঙ্গে এটি প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাওয়ারও এক আতঙ্কের নাম। তাই তাদের এখন একটাই প্রশ্ন- ভাঙন আরও ভয়াবহ হওয়ার আগেই কি শুরু হবে স্থায়ী ভাঙনরোধের কাজ?
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পদ্মার তীব্র স্রোতে গোয়ালন্দের বিভিন্ন এলাকায় নদীর পাড় ভাঙছে। কোথাও নদীর পাড়ে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে, আবার কোথাও স্রোতের টানে হঠাৎ করেই মাটির অংশ নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভাঙন দেখা গেছে দেবগ্রাম ইউনিয়নের মুন্সিবাজার এলাকায়। পাশাপাশি দৌলতদিয়া ইউনিয়নের লালু মন্ডল পাড়া, ১ নম্বর বেপারী পাড়া, নতুন পাড়া ও শাহ বেপারী পাড়া এলাকাতেও রয়েছে ভাঙনের ঝুঁকি।
ভাঙনের কারণে ফসলি জমি ও নদীতীরবর্তী স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীর খুব কাছেই রয়েছে কবরস্থান, বসতভিটা, মসজিদ, ঈদগাহ, হাটবাজার ও রাস্তাঘাট। ভাঙন অব্যাহত থাকায় এসব স্থাপনা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন স্থানীয়রা। অনেকেই নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে নিজেদের জমি ও বসতভিটার দিকে তাকিয়ে আতঙ্কে সময় পার করছেন। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
নদীপাড়ের বাসিন্দা মহিরন নেছা বলেন, নদীভাঙনে এরই মধ্যে তার প্রায় দেড় বিঘা জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে চলে গেছে। ভাঙনের কারণে অন্যের জায়গায় আশ্রয় নিয়ে থাকতে হচ্ছে তাকে। এখন নিজের শেষ সম্বলটুকুও হারানোর আতঙ্কে রয়েছেন তিনি। মহিরন নেছার দাবি, ত্রাণ বা খাদ্য সহায়তা নয়, তারা চান স্থায়ী নদীশাসন। দ্রুত নদীভাঙন রোধ করা না গেলে তার বাবার-চাচার কবর ও ছেলের কবরটিও নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
পাড়ের বাসিন্দা কাউছার ফকীর বলেন, জন্মের পর থেকেই তারা পদ্মার ভাঙন দেখে আসছেন। বছরের পর বছর ভাঙতে ভাঙতে গোয়ালন্দের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এখন দ্রুত কার্যকর নদীশাসনের উদ্যোগ না নিলে দেবগ্রাম ও দৌলতদিয়াসহ আরও এলাকা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণ নদীপাড়ের মানুষের নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত করতে তিনি সরকারের কাছে দ্রুত স্থায়ী নদীশাসনের দাবি জানান।
৭৫ বছর বয়সি এক বাসিন্দা কালাম বেপারী জানান, নদীভাঙনে তাদের পরিবারের একাধিক কবরসহ বিস্তীর্ণ জমি হুমকির মুখে পড়েছে। প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি বারবার নদীভাঙন দেখছেন। বর্তমানে একদিনেই কয়েক কাঠা জমি নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত জিওব্যাগ ফেলা ও কার্যকর নদীশাসনের দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, নদীশাসন না হলে তাদের ঘরবাড়ি করার মতো জায়গাটুকুও থাকবে না।
এ ব্যাপারে রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. তাজমিনুর রহমান বলেন, নতুন করে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে দেবগ্রামের মুন্সিবাজার ও দৌলতদিয়া এলাকায় ভাঙনের মাত্রা তীব্র আকার ধারণ করেছে। পানি বৃদ্ধির বিষয়টি তারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন।
তিনি বলেন, রাজবাড়ী জেলায় প্রায় ৩০টি স্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় তিন কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ভাঙনরোধে কাজ চলছে।
তাজমিনুর রহমান বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় ৫৫০ মিটার অংশে জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে জিওব্যাগ দিয়ে প্রতিরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ভাঙনের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজও বেগবান করা হচ্ছে।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সাইফুল হুদা বলেন, পদ্মাপাড়ের মানুষের জন্য নদীভাঙন দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা। নতুন করে মুন্সিবাজার এলাকায় ভাঙনের বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নজরে রয়েছে।
তিনি বলেন, পদ্মাপাড়ের অধিবাসী, বিশেষ করে গোয়ালন্দবাসীর এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রয়োজন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে পরামর্শ করে কীভাবে সঠিক ও কার্যকর সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
