মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সমন্বিত কর্মকৌশল গ্রহণ করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এ পরিকল্পনার আওতায় প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার চতুর্থ বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির ব্রিফিংয়ে দেয়া বক্তব্যের আলোকে গতকাল তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয় সরকারি তথ্য বিবরণীতে।
জ্বালানি ও সরকারি ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা সরকারি কার্যক্রমে গাড়ির জন্য মাসিক বরাদ্দ করা জ্বালানির ৩০ শতাংশ কম নেবেন। সেই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণ দেয়াও বন্ধ থাকবে বলে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই সঙ্গে সরকারি অর্থায়নে সব বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বন্ধ থাকবে। প্রশিক্ষণ ব্যয় ছাড়া অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ব্যয় ৫০ শতাংশ হ্রাস করতে হবে। সভা ও সেমিনারে আপ্যায়ন ব্যয় ৫০ শতাংশ হ্রাস করতে হবে এবং সেমিনার-কনফারেন্স ব্যয় ২০ শতাংশ হ্রাস করতে হবে।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের বিষয়ে সরকারি তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, ভ্রমণ ব্যয় ৩০ শতাংশ, সরকারি খাতে গাড়ি, জলযান, আকাশযান ও কম্পিউটার কেনা শতভাগ বন্ধ এবং সরকারি গাড়িতে মাসিক ভিত্তিতে বরাদ্দ করা জ্বালানির ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমাতে হবে। সরকারি কার্যালয়ে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমাতে হবে। এছাড়া আবাসিক ভবন শোভাবর্ধন ব্যয় ২০ শতাংশ, অনাবাসিক ভবন শোভাবর্ধন ব্যয় ৫০ শতাংশ এবং ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় শতভাগ কমানোর বিষয়েও মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় বলে তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়েছে।
এর আগে সংসদ ভবনের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টায় বিএনপি সরকারের চতুর্থ মন্ত্রিসভা বৈঠক শুরু হয়, যা চলে প্রায় রাত ১২টা পর্যন্ত। এরপর বৈঠকের বিষয়বস্তু নিয়ে ব্রিফ করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। ব্রিফিংয়ে সরকারের বিদ্যুৎসাশ্রয়ী নীতির কারণে কতটুকু বিদ্যুৎ সাশ্রয় হতে পারে সেই প্রশ্ন তোলেন সাংবাদিকরা। সে সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, কতটুকু সাশ্রয় হবে সে হিসাবটি পরে জানানো হবে। তার পরদিনই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সুনির্দিষ্ট হিসাবটি প্রকাশ করল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
এ বিষয়ে তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, বিদ্যমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বিত কর্মকৌশলে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা দেয়া, সারের উৎপাদন, মজুদ ও সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিত করা, শিল্প উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার স্বার্থে শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় জ্বালানির জোগান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অব্যাহত রাখার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, আগামী তিন মাস দেশব্যাপী সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহার করতে হবে। আলোকসজ্জা পরিহারসহ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে গৃহীত কর্মকৌশল বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রচার কার্যক্রম গ্রহণ করবে। প্রয়োজনে পর্যাপ্তসংখ্যক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশের বিদ্যুৎ সক্ষমতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, বর্তমানে সারা দেশে (ক্যাপটিভ, আমদানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নেট মিটারিংসহ) সর্বমোট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ৩২ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াট। তার মধ্যে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। দেশে বিদ্যুতের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে প্রতিদিন গড়ে ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
