২০১৮ সালে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেন জুয়েল রানা। এরপর চার বছর আদালতে ওকালতিও করেছেন। কিন্তু কালো কোট আর আইনি প্যাঁচের মাঝে জীবনের তৃপ্তি খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে বড় আইনজীবী হবে, কিন্তু জুয়েলের মন পড়ে থাকত ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুর সেই বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ আর মেঠো পথে। সেই টানেই একদিন ওকালতি ছেড়ে হাতে তুলে নিলেন ক্যামেরা; শুরু হলো ‘চিত্ত মিডিয়া’।
২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করা ‘চিত্ত মিডিয়া’র বয়স এখনো এক বছর পূর্ণ হয়নি। কিন্তু এরই মধ্যে ফেসবুকে জুয়েল রানার ফলোয়ার ছাড়িয়েছে ৩৫ লাখ। তার একেকটি ভিডিওর ভিউ দুই থেকে তিন কোটি। ওকালতি ছেড়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটর হওয়ার এই যাত্রা কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং কৃষি ও প্রকৃতির সঙ্গে জীবনবোধ আর সাহিত্যের এক অনন্য মিশেল।
জুয়েল রানার ভিডিওর বিশেষত্ব হলো তার উপস্থাপনা। কোনো ভিডিওতে দেখা যায় মাছের ঘেরের ওপর কুঁড়েঘরে বসে আল মাহমুদের ‘পানকৌড়ির রক্ত’ নিয়ে কাব্যিক বর্ণনা করছেন তিনি। আবার কখনো হেলে পড়া এক খেজুর গাছকে উপজীব্য করে বলছেন, ‘টিকে থাকার ইচ্ছাটা আগে নিজের থাকতে হবে।’ তার ভিডিওতে উঠে আসে গরু দিয়ে হালচাষ করা বয়স্ক কৃষকের সুখ-দুঃখের গল্প। জ্ঞানদান আর বিনোদনের চেয়েও তিনি প্রাধান্য দেন কৃষকের জীবনকে এক দার্শনিক বোধ থেকে ফুটিয়ে তুলতে।
জুয়েল ও তার দলের দুই সদস্য ইকরামুল কবির ও হাসানুজ্জামান ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গার বিস্তীর্ণ জনপদ চষে বেড়ান সঠিক শব্দ ও দৃশ্যের খোঁজে। ভিডিওতে কৃত্রিম সুরের বদলে তারা ব্যবহার করেন প্রকৃতির নিজস্ব ধ্বনি। জুয়েল বলেন, “একটি ঘুঘুর ডাক রেকর্ড করার জন্য একবেলা কিংবা শেয়ালের ডাক নিতে রাতভর মাঠের মধ্যে অপেক্ষা করতে হয়েছে আমাদের।”
গ্রামীণ মানুষের বিশ্বাস অর্জনই তার কাজের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ক্যামেরার সামনে সহজ হতে না চাওয়া সাধারণ মানুষের জীবনবোধ তুলে ধরাই তার সার্থকতা। দর্শকদের ইতিবাচক সাড়া তাকে অনুপ্রাণিত করে।
তার মতে, “সবাই যদি চাকরি করে, তবে পৃথিবীর রূপ-রসের বর্ণনা দেবে কে? এর জন্য তো দু-একটা পাগল থাকা চাই!”
ঝিনাইদহ শহরে স্ত্রী নিশা ও কন্যা জেসিকে নিয়ে জুয়েলের সংসার। একসময়ের আইনজীবী জুয়েল রানা এখন পুরোপুরি প্রকৃতির কবি ও কথক। তার তৈরি করা প্ল্যাটফর্ম ‘চিত্ত মিডিয়া’ কেবল বিনোদন নয়, বরং মানবিকতা আর শিক্ষার এক নতুন ক্ষেত্র হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।
