বিএনপির প্রার্থী শ্যামলের খেলাপি ঋণ ১৪০৭ কোটি টাকা: টিআইবি

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৫৯ এএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর-বিজয়নগর) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামলের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৪০৭ দশমিক ৮২ কোটি টাকা। ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশে’র (টিআইবি) একটি প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

টিআইবি গত ২২ জানুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ‘নির্বাচনী হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন— এই পাঁচটি নির্বাচনের নির্বাচনী হলফনামায় প্রার্থীদের দেওয়া তথ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে টিআইবি।

প্রতিবেদনে পাঁচটি সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের হলফনামার তুলনামূলক বিশ্লেষণের পাশাপাশি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া দল ও প্রার্থীর সংখ্যা, নির্বাচন-ভিত্তিক ইসলামী ও অন্যান্য দলীয় প্রার্থীর সংখ্যা, নারী ও পুরুষ প্রার্থীর অনুপাত, প্রার্থীদের বাৎসরিক আয়, অতীতে মামলা ছিলো এমন প্রার্থীর সংখ্যা, শীর্ষ দলগুলোর ঋণ বা দায়গ্রস্ত প্রার্থীর তালিকাসহ বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্রতিবেদন তৈরিতে টিআইবি’র হলফনামা-ভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ পদ্ধতি

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের সকল হলফনামা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে পিডিএফ আকারে সংগ্রহ করা হয়।
সংগৃহীত প্রায় ২৪০০ পিডিএফ হলফনামার যাবতীয় তথ্য KoboToolbox দিয়ে তৈরি ডেটা ফর্ম এর মাধ্যমে একদল প্রশিক্ষিত ডেটা অ্যাসিসট্যান্ট সম্পূর্নভাবে ডিজিটাইজড করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।

পরবর্তীতে ‘হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি’ ইন্টারঅ্যাক্টিভ ড্যাশবোর্ডে থাকা নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের সামগ্রিক তথ্যের সাথে বিশ্লেষণ কাঠামো অনুযায়ী তুলনা করা হয়।

ডেটা প্রক্রিয়াকরণে পাইথন ও পাওয়ার কোয়েরি ব্যবহার; ডেটা বিশ্লেষণ ও উপস্থাপনায় পাওয়ার বিআই ও ড্যাক্সের ব্যবহার করা হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় পাঁচটি নির্বাচনের আট হাজারের বেশি হলফনামার দেওয়া আটটি তথ্যের বহুমাত্রিক ও তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ‘হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি’ ড্যাশবোর্ডটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

টিআইবি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে এবং চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা ১৯৮১ জন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলীয় প্রার্থী ৮৭ শতাংশ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ১৩ শতাংশ। টিআইবি বলছে, বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্ধীতায় নারীর অংশগ্রহণ খুবই কম। জাতীয় সংসদ নির্বাচনও এর ব্যতিক্রম নয়। এবার নির্বাচনে ৫ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়নি। পুরুষ প্রার্থী ৯৫.৯৮ শতাংশ এবং নারী প্রার্থী মাত্র ৪.০২ শতাংশ।

প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণে টিআইবি আরও জানান, তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাৎসরিক আয় করেন প্রায় ২৮ ভাগের কিছু বেশি প্রার্থী। ৩৫ লাখ টাকার বেশি আয় করেন ১৬ শতাংশের বেশি প্রার্থী। অতীতে মামলা ছিলো ৭৪০ জন (৩১.৬৪%) প্রার্থীর বিরুদ্ধে।

শীর্ষ দলগুলোর ঋণ বা দায়গ্রস্ত (ঋণখেলাপি) প্রার্থী

টিআইবি তাদের প্রতিবেদনে ১০ জন প্রার্থীর নাম এবং তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ উল্লেখ করেছে। এদের মধ্যে একজন স্বতন্ত্র এবং বাকি ৯ জন বিএনপির প্রার্থী। ঋণখেলাপি প্রার্থীদের তালিকায় প্রথম পাঁচজন হলেন— ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এস. এ. কে একরামুজ্জামান (৩,১৫৫.৭৫ কোটি টাকা), হবিগঞ্জ-৪ এর বিএনপি প্রার্থী এস এম ফয়সল (২,০৪১.৪৮ কোটি টাকা), ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ এর বিএনপি প্রার্থী মোঃ খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল (১,৪৭০.৮২ কোটি টাকা), মানিকগঞ্জ-৩ এর বিএনপি প্রার্থী আফরোজা খানম (১৩৬০.৩৬ কোটি টাকা) এবং মুন্সিগঞ্জ-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী মোঃ আব্দুল্লাহ্ (১.১১৫.৭২ কোটি টাকা)।

টিআইবি’র সার্বিক পর্যবেক্ষণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। যাতে চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা ১৯৮১ জন। এতে ২৪৯ মোট প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের প্রায় ১৩ শতাংশ প্রার্থী স্বতন্ত্র।

এবারের নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলগুলোর প্রার্থীদের সংখ্যা বেড়েছে বড় আকারে। মোট প্রার্থীর ৩৬ ভাগের বেশি ইসলামপন্থী দলগুলোর। বিগত ৫টি নির্বাচনের মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ।

প্রার্থীদের মধ্যে ৪৮ শতাংশের বেশি প্রার্থী মূল পেশা বিবেচনায় ব্যবসায়ী। আইন ও শিক্ষক পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন যথাক্রমে ১২.৬১ এবং ১১.৫৬ শতাংশ প্রার্থী। রাজনীতিকে পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন ১.৫৬ শতাংশ প্রার্থী।

অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের মোট মূল্যের ভিত্তিতে ২৭ জন শত-কোটিপতি প্রার্থী। এই তালিকার শীর্ষ তিনজনই বিএনপি দলীয় প্রার্থী। তারা হলেন যথাক্রমে ৬১৯.৯০ কোটি টাকা নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের মোঃ আমিনুল ইসলাম, ৬০৭.৫৮ কোটি টাকা নিয়ে ফেনী-৩ আসনে আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং ৫৮১.১১ কোটি টাকা নিয়ে কুষ্টিয়া-৩ আসনে মোঃ জাকির হোসেন সরকার।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থীর সাড়ে ২৫ শতাংশরই কোনো না কোনো ঋণ বা দায় আছে। প্রার্থীদের সর্বমোট ঋণের পরিমাণ ১৮৮৬৮.৫২ কোটি টাকা। সর্বশেষ পাঁচ নির্বাচনের মধ্যে এবার ঋণ বা দায়গ্রস্ত প্রার্থী সবচেয়ে কম হলেও তাদের মোট ঋণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৬৭ শতাংশ, টাকার পরিমাণে যা ১৭৪৭১.৬৭ কোটি টাকা। এবার দল হিসেবে বিএনপির প্রার্থীদের ৫৯. ৪১ শতাংশ প্রার্থীই ঋণ বা দায়গ্রস্ত।
এবারের নির্বাচনে বর্তমানে মামলা আছে ৫৩০ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে, যা মোট প্রার্থীর ২২.৬৬ শতাংশ। আর অতীতে মামলা ছিলো ৭৪০ জন বা ৩১.৬৪% প্রার্থীর বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর