ভূমিহীনরা কেন চাকরির ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েন?

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২১ এএম

লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ পেয়েছিলেন মিশন আচার্য। মেধাতালিকায় উপজেলা পর্যায়ে তার অবস্থান ছিল ১৭তম। কিন্তু নিয়োগপত্র পাওয়ার সময় স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। কারণ, তার পরিবারের নিজস্ব কোনো বসতভিটা নেই। তারা দীর্ঘদিন ধরে ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন।

মিশনের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত জটিলতার অবসান হয়েছে। তার নামে থাকা জমির দলিলসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানোর পর নিয়োগের পথও খুলেছে।

তবে এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে-সরকারি চাকরির জন্য একজন নাগরিকের নিজের নামে বসতভিটা থাকা কি বাধ্যতামূলক?

মিশন আচার্য ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। তার পরিবার চার দশকের বেশি সময় ধরে ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকায় বসবাস করছে বলে স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। তার জাতীয় পরিচয়পত্রেও ওই এলাকার ঠিকানা রয়েছে। চাকরির আবেদনেও তিনি একই ঠিকানা ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু নিয়োগের আগে ঠিকানা যাচাইয়ে জটিলতা দেখা দেওয়ায় তার নিয়োগ প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে আটকে যায়।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, গোয়েন্দা সংস্থার যাচাইয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে স্থায়ী ঠিকানার মিল নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। পরে তার নামে থাকা জমির দলিলসহ অন্যান্য নথি সংগ্রহ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়।

এখানেই মূল প্রশ্নটি আসে। একজন নাগরিক কোন এলাকায় জন্মেছেন, সেখানেই বেড়ে উঠেছেন, তার জাতীয় পরিচয়পত্রে ওই এলাকার ঠিকানা রয়েছে এবং স্থানীয়ভাবে তার বসবাসের প্রমাণও আছে-কিন্তু নিজের নামে কোনো জমি নেই। শুধু এই কারণে কি তাকে ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না?

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে উপজেলা বা শিক্ষা থানাভিত্তিক নিয়োগের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে একজন প্রার্থী কোন এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা, সেটি নিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদসহ বিভিন্ন নথির মাধ্যমে পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই করা হয়।

কিন্তু স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার বিষয়টি আর সম্পত্তির মালিকানা এক বিষয় নয়। একজন মানুষ ভাড়া বাসায় থেকেও কোনো এলাকার দীর্ঘদিনের বাসিন্দা হতে পারেন। তার নিজের নামে জমি না থাকলেও তার নাগরিক পরিচয়, ভোটার নিবন্ধন, শিক্ষাজীবন ও সামাজিক সম্পর্ক একটি নির্দিষ্ট এলাকার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।

বাংলাদেশে এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। নদীভাঙনে বসতভিটা হারানো পরিবার, দিনমজুর, নিম্ন আয়ের মানুষ কিংবা শহরের ভাড়া বাসায় বসবাসকারী অসংখ্য নাগরিকের নিজের নামে জমি নেই। তাদের নাগরিকত্ব বা কোনো এলাকায় স্থায়ী বসবাসের পরিচয় কি শুধু সম্পত্তির মালিকানার ওপর নির্ভর করবে-এই প্রশ্নটি তাই গুরুত্বপূর্ণ।

অবশ্যই সরকারি চাকরিতে তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। কোনো প্রার্থী ভুল বা ভুয়া তথ্য দিলে সেটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও থাকতে হবে। একইভাবে স্থানীয় বাসিন্দার শর্ত থাকলে প্রশাসনের দায়িত্ব হলো সেটি যথাযথভাবে যাচাই করা।

কিন্তু ঠিকানা যাচাইয়ের বিষয়টি যদি সরাসরি জমির মালিকানার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তখন বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। কারণ, স্থায়ী ঠিকানা প্রমাণের ক্ষেত্রে কোন কোন নথি গ্রহণযোগ্য এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে বাস্তব বসবাসের ঠিকানার অমিল হলে তা কীভাবে সমাধান করা হবে-এসব বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা থাকা জরুরি।

মিশনের ঘটনা দেখিয়েছে, একটি ঠিকানা নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতা একজন যোগ্য প্রার্থীর নিয়োগকে কতটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে পারে। পরে তার নিয়োগের জটিলতা কাটলেও প্রশ্নটি থেকে যায়।

সরকারি চাকরি মূলত যোগ্যতা, মেধা ও নির্ধারিত আইনগত শর্ত পূরণের ভিত্তিতে পাওয়ার সুযোগ। কারও নিজের নামে কতটুকু জমি আছে, সেটি যদি কোনো পদের যোগ্যতার শর্ত না হয়, তাহলে ঠিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও সম্পত্তির মালিকানাকে যেন অঘোষিত শর্তে পরিণত করা না হয়।

ভূমিহীন বা ভাড়াটে নাগরিকদের জন্য স্থায়ী বাসিন্দা প্রমাণের গ্রহণযোগ্য নথি কী হবে, সে বিষয়ে স্পষ্টতা থাকলে এমন জটিলতা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর