ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গু আক্রান্ত আরও দুই রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর হাসপাতালটিতে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে। একই সময়ে নতুন করে ৫৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের সহকারী ফোকালপারসন ডা. মো. সেলিম উদ্দিন ২৪ ঘণ্টার সর্বশেষ আপডেটে এসব তথ্য জানান।
মারা যাওয়া দুজন হলেন ভালুকা উপজেলার নূর হোসেনের স্ত্রী রাশিদা খাতুন (৪২) এবং শ্রীপুর উপজেলার জয়নাবাজার এলাকার জাফর আলী (৭০)।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রাশিদা খাতুন শনিবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে, জাফর আলী রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টার দিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে ১৩১ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮৩ জন পুরুষ, ৪২ জন নারী ও ৬ জন শিশু।
পুরুষ রোগীদের মধ্যে দুজন আইসিইউতে এবং একজন কেবিনে চিকিৎসাধীন। অন্যরা সাধারণ ওয়ার্ডে রয়েছেন। নারী রোগীদের সবাই সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শিশুদের মধ্যে চারজন ছেলে ও দুজন মেয়ে রয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মোট ডেঙ্গু রোগীর বড় একটি অংশ গত জুলাই ও আগস্ট মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
হাসপাতালের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ২২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১১ জন, মার্চে ১৫ জন, এপ্রিলে ৯ জন, মে মাসে ২০ জন, জুনে ৫৭ জন এবং জুলাইয়ে ৩৬০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। আগস্টে এ সংখ্যা একলাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৯৬৭ জনে।
অর্থাৎ, বছরের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় জুলাই ও আগস্টে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে আগস্টে রোগী ভর্তির সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এতে বর্ষা মৌসুমের শেষভাগে ময়মনসিংহে ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়ার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে একজন, জুনে তিনজন, জুলাইয়ে দুজন এবং আগস্টে চারজন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সেপ্টেম্বরে এখন পর্যন্ত আরও আটজনের মৃত্যু হয়েছে।
বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত প্রতি মাসে ৯ থেকে ২২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। জুনে রোগী ভর্তি বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ জনে। জুলাইয়ে তা একলাফে বেড়ে হয় ৩৬০ জন। এরপর আগস্টে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায় এবং এক মাসেই ৯৬৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগী মনোয়ারা বেগম বলেন, হঠাৎ জ্বর ও শরীর ব্যথা শুরু হলে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন।
তিনি বলেন, হাসপাতালে রোগীর এত চাপ যে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। দ্রুত মশা নিধনের পাশাপাশি হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা করা জরুরি।
নগরীর বাসবাড়ী কলোনির বাসিন্দা রহমত আলী বলেন, হঠাৎ শরীরে জ্বর আসে। প্রথমে স্বাভাবিক জ্বর মনে করে বিষয়টি গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু পরদিন হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে দ্রুত আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, আমি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত।
তিনি আরও বলেন, তখন রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা নেমে দাঁড়ায় ৬৮ হাজারে। চার দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি। কিন্তু ভেতরে কোনো জায়গা না থাকায় বারান্দাতেই থাকতে হচ্ছে। হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, ‘প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শুরু থেকেই হাসপাতালের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আইসোলেটেড ওয়ার্ড হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে বিশেষ ব্যবস্থাপনা টিমের মাধ্যমে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসক, নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়ে এ টিম গঠন করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় হাসপাতালের ফোকালপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ডা. এমদাদ এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট ফোকালপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ডা. সেলিম। তাদের তত্ত্বাবধানে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচালক, উপপরিচালক, সহকারী পরিচালকসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিয়মিত চিকিৎসাসেবা ও সার্বিক পরিস্থিতি তদারকি করছেন।’
ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, ‘ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ১ হাজার শয্যার। ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরও বেড়ে গেলে অতিরিক্ত রোগীদের জন্য জায়গা ব্যবস্থাপনা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তবে এটি জাতীয় পর্যায়ের একটি সংকট। পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখছে।’
তিনি বলেন, রোগীর চাপ বাড়লে ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের পুরো অংশকে আইসোলেটেড ডেঙ্গু ওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে বলেও জানান তিনি। তার দাবি, চিকিৎসাসামগ্রীর কোনো সংকট নেই। রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বিশেষ ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ ও মশারির ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
