মালয়েশিয়ার অনেক কর্মীর কাছে সামাজিক নিরাপত্তা সংস্থা পারকেসো-তে দেওয়া অর্থ কেবল মাসিক বেতনের স্লিপে একটি নিয়মিত কাটতি হিসেবেই দেখা যায়। এতে হাতে পাওয়া বেতন কিছুটা কমে গেলেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই ব্যবস্থাটি কর্মীদের চাকরি হারানো, অক্ষমতা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা এবং দীর্ঘমেয়াদি আয় সংকটের সময় গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা দিয়ে থাকে।শুধু মালয়েশিয়ান নাগরিকই নয়, দেশটিতে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকরাও এখন পারকেসোর আওতায় রয়েছেন। ২০১৯ সাল থেকে বিদেশি কর্মীদের জন্য “এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম” বাধ্যতামূলক করা হয় এবং ২০২৪ সালের জুলাই থেকে “ইনভ্যালিডিটি স্কিম”ও চালু করা হয়েছে।
মালয়েশিার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৮ লাখের বেশি বৈধ বাংলাদেশি অস্থায়ী কর্মসংস্থান পাসধারী কর্মী রয়েছেন। বাংলাদেশ বর্তমানে মালয়েশিয়ায় নিম্নদক্ষ বিদেশি শ্রমিকের সবচেয়ে বড় উৎস দেশগুলোর একটি।
পারকেসোর তথ্য অনুযায়ী, বৈধ পাসধারী বিদেশি কর্মীদের নিবন্ধন এবং মাসিক চাঁদা জমা দেওয়া নিয়োগকর্তাদের জন্য বাধ্যতামূলক। এর আওতায় নির্মাণ, উৎপাদন, বাগান, কৃষি, সেবা এবং গৃহকর্মী খাতের লাখ লাখ বিদেশি শ্রমিক অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
বর্তমানে ন্যূনতম মজুরি ১,৭০০ রিঙ্গিত পাওয়া একজন কর্মী প্রতি মাসে পারকেসোতে ৮.৫০ রিঙ্গিত এবং এমপ্লয়মেন্ট ইন্স্যুরেন্স সিস্টেম (ইআইএস)-এ ৩.৪০ রিঙ্গিত অবদান রাখেন। অন্যদিকে নিয়োগকর্তারা পারকেসোতে ২৯.৭৫ রিঙ্গিত এবং ইআইএস-এ আরও ৩.৪০ রিঙ্গিত জমা দেন।
সেন্টার ফর ফিউচার লেবার মার্কেট স্টাডিজের অর্থনীতিবিদ ঝারিফ লুকমান হাশিম বলেন, অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে কর্মীদের জন্য মৌলিক সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
তিনি জানান, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পাশাপাশি পারকেসোর “এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম” কর্মস্থলে যাতায়াতের সময় দুর্ঘটনায় আহত হলেও সুরক্ষা দেয়। এছাড়া “ইনভ্যালিডিটি স্কিম” অক্ষমতা বা মৃত্যুর ঘটনায় সার্বক্ষণিক সুরক্ষা প্রদান করে।
অন্যদিকে ইআইএস চাকরি হারানো কর্মীদের জন্য অস্থায়ী আর্থিক সহায়তা ও নতুন চাকরি খুঁজে পেতে সহায়তা দেয়। এ ব্যবস্থার আওতায় পুনর্বাসন সহায়তা, ডায়ালাইসিস চিকিৎসা, কৃত্রিম অঙ্গ (প্রস্থেটিকস) এবং কাজে ফিরে যাওয়ার বিশেষ কর্মসূচিও রয়েছে।
ঝারিফ বলেন, বেসরকারি বিমার তুলনায় পারকেসো একটি বাধ্যতামূলক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকির ভিত্তিতে নয় বরং সম্মিলিত তহবিল ও বেতনের ভিত্তিতে অবদান নির্ধারণ করা হয়। ফলে কম আয়ের কর্মী কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরাও এই সুরক্ষা থেকে বাদ পড়েন না।
তার ভাষায়, শুধু চিকিৎসা খরচ বহন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। দুর্ঘটনা বা অসুস্থতার পর অধিকাংশ পরিবারের সবচেয়ে বড় সংকট হয় আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কাজ করার সক্ষমতা হারানো। তিনি আরও বলেন, আহত কর্মীদের পুনরায় কর্মসংস্থানে ফিরিয়ে এনে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতেও পারকেসো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মালয়েশিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক রিসার্চের সিনিয়র ফেলো আজিজুল আমিলুদ্দিন বলেন, পারকেসোর মতো সামাজিক বিমা ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে বেসরকারি বিমা পুরোপুরি কার্যকর হতে পারে না। তার মতে, ঝুঁকিপূর্ণ পেশার কর্মীদের ক্ষেত্রে যদি শুধু বেসরকারি বিমার ওপর নির্ভর করতে হতো, তাহলে তাদের অনেক বেশি প্রিমিয়াম দিতে হতো।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মালয়েশিয়ায় বয়স্ক জনগোষ্ঠী বাড়তে থাকায় সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপও বাড়ছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে ৬৫ বছর ও তদূর্ধ্ব নাগরিকের হার মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল ৭.৬ শতাংশ।
আজিজুল বলেন, প্রবীণদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রাখতে উৎসাহিত করার নীতি ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে তাদের শারীরিক সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং অবদানকারীর সংখ্যা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বর্তমানে পারকেসোর অবদানের হার ২.২৫ শতাংশ, যা প্রতিষ্ঠার পর থেকে অপরিবর্তিত রয়েছে। টেকসই ব্যবস্থা হিসেবে অবদানের হার না বাড়িয়ে বরং বেতনের সর্বোচ্চ সীমা ৫,০০০ রিঙ্গিত থেকে বাড়িয়ে ৬,০০০ রিঙ্গিত করা হয়েছে।
ঝারিফ বলেন, পারকেসোকে শুধু বেতনের কাটতি হিসেবে না দেখে শ্রমশক্তির স্থিতিশীলতায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।
আজিজুলের মতে, এমন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকলে আর্থিক ও সামাজিক চাপ শেষ পর্যন্ত পরিবার এবং সরকারি কল্যাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরই এসে পড়বে। তিনি বলেন, সামাজিক বিমাকে শুধু ব্যক্তিগত খরচ হিসেবে দেখা উচিত নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সহনশীলতার জন্য একটি সম্মিলিত বিনিয়োগ।
