মিয়ানমারের ভূমিকম্পে কাঁপলো দেশ

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৫৬ এএম

১৭ মিনিটের ব্যবধানে পরপর দুই দফা শক্তিশালী ভূমিকম্প হলো। মঙ্গলবার রাত ৯টা ৩৪ মিনিটে ৬ রিকটার স্কেলের ভূমিকম্পের ১৭ মিনিট পর ৫ দশমিক ৩ রিকটার স্কেলের আরো একটি ভূমিকম্প হয়েছে। 

উভয় ভূমিকম্পের উৎপত্তি ছিল মিয়ানমারে। আর এই ভূমিকম্প দুটি মাটির ৬২ কিলোমিটারের গভীরে উৎপত্তি হয়েছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসজিএস ওয়েবসাইটে প্রথম ভূমিকম্পটিকে ৫ দশমিক ৯ রিকটার স্কেল হিসেবে ঘোষণা করলেও ইন্ডিয়ান সিসমোলজি সেন্টার ৬ রিকটার স্কেল হিসেবে ঘোষণা করেছে। 

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আগারগাঁও থেকে ৫২১ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের যে স্থানে ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়েছে সেখান দিয়ে মূলত একটি ফল্ট লাইন রয়েছে। এই ফল্ট লাইন এলাকায় প্রায়ই এই মাত্রার ভূমিকম্প হয়ে থাকে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক ও বিশিষ্ট ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন,‘মিয়ানমারের ওই এলাকায় দুটো ফল্ট লাইন রয়েছে। একটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীন ফল্ট লাইন এবং অপরটি ইন্দোনেশিয়ান সুন্দা খাত থেকে উত্তর দিকে আসা ফল্ট লাইন। এই ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল সুন্দা খাত থেকে আসা ফল্ট লাইনের প্রান্ত ভাগের পূর্ব দিকে এবং মিয়ানমারের ফল্ট লাইনের পশ্চিমে।’

তিনি আরো বলেন, পর পর দুটি ভূমিকম্পের অর্থ হলো একটি ছিল আফটার শক। তবে এই ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। 

একই মন্তব্য করেন বিশিষ্ট ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মেহেদি আনসারী। তিনি বলেন,‘রাত সাড়ে ৯টার দিকে প্রায় ২০ মিনিটের ব্যবধানে দুটো ভূমিকম্প হয়েছে। এতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য এলাকায় বেশি কম্পন অনুভূত হলেও ঢাকায় তুলনামূলকভাবে কম কম্পন অনুভূত হয়েছে।’

তবে এই ভূমিকম্পে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে ড. মেহেদী আনসারী বলেন, আমাদেরকে ভূমিকম্প সহনীয় ভবন নির্মাণে এগিয়ে আসতে হবে এবং একইসাথে তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে জোনিং ম্যাপ তৈরি করতে হবে। আর তা করা গেলে কোন এলাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি কেমন রয়েছে তা নির্ধারণ করা সহজ হবে।

বিকেলে সাতক্ষীরায় হয়েছিল ৪.১ রিকটার স্কেলের ভূমিকম্প
রাতে মিয়ানমারে দুই দফায় ভূমিকম্প হওয়ার আগে বিকেল ৪ টা ৩৬ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডে সাতক্ষীরায় ৪ দশমিক ১ রিকটার স্কেলের একটি ভূমিকম্প হয়েছে। এবিষয়ে ড. মেহেদী আনসারী বলেন,‘ সাতক্ষীরার ভূমিকম্পটি বিক্ষিপ্ত ভূমিকম্প হতে পারে। মিয়ানমারের ভূমিকম্পের সাথে এর কোনো সম্পর্ক থাকার কথা নয়। ’ 

এদিকে এর আগে গত সোমবার ঢাকার উত্তরে কালিয়াকৈর এলাকায় ভোর ৬টা ৩০ মিনিটে ৩ দশমিক ২ রিকটার স্কেলের ভূমিকম্প হয়েছে। এর আগে এই এলাকার আশপাশে গত ২২ নভেম্বর ৫ দশমিক ৭ রিকটার স্কেলের ভূমিকম্প হয়েছিল নরসিংদীতে। সেই ভূমিকম্পে পুরো ঢাকা শহর কেঁপে উঠেছিল এবং পরপর কয়েক দফা আফটার শক ভূমিকম্প হয়েছিল। এই এলাকার আশপাশে যেসব ছোটো মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে সেগুলোকে আফটার শক ভূমিকম্প বলে নিজের সোস্যাল মিডিয়ার পোস্টে শেয়ার করেছেন ভূমিকম্প নিয়ে আমেরিকায় পিএইডি গবেষণারত বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ভূ-তত্ব) আখতারুল আহসান।

স্বাভাবিকভাবেই চট্টগ্রাম ও সিলেট ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ মিয়ানমার (বার্মা) সীমান্তের পাশ দিয়ে একটি ফল্ট লাইন (প্লেট বাউন্ডারির সাথে যুক্ত কোনো লাইন বা বিক্ষিপ্ত অবস্থায় কোনো চ্যুতি) রয়েছে। 

আর এই ফল্ট লাইনটি আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ থেকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্ত এবং বাংলাদেশ ভারত সীমান্তের ত্রিপুরা, বিহার, মেঘালয়, শিলং হয়ে হিমালয়ান পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই এলাকায় ভূমিকম্প বেশি উৎপত্তি হয়ে থাকে এবং তা আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্র্ন। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের দেশের পূর্ব পাশ দিয়ে ইন্দো-অষ্ট্রেলিয়া প্লেট বাউন্ডারি ও বার্মায় একটি ছোটো প্লেট বাউন্ডারি রয়েছে। 

দেশের প্রান্ত সীমায় যেসব ভূমিকম্প উৎপত্তি লাভ করছে সেগুলো প্লেট বাউন্ডারি বরাবর। তাই চট্টগ্রাম ও সিলেট জোন অনেকটা ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। 

উল্লেখ্য, সারবিশ্বে প্রতিবছর দুই হাজার বার ভূমিকম্প হয়। এদের মধ্যে বছরে ১০০ ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়ে থাকে। 

ছোটো-বড় ২৭টি প্লেট নিয়ে গঠিত পৃথিবী প্রতিনিয়ত গতিতে থাকার কারণে প্লেটগুলোর প্রান্তসীমায় ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়ে থাকে। ইন্ডিয়া ও বার্মা প্লেটের মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণেই টেকনাফ থেকে নেপাল পর্যন্ত হিমালয়ান পর্বতমালা পর্যন্ত গঠিত হয়েছিল। 

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন