ঢাকা মহানগরীর পল্লবী এলাকায় পরিবহন খাত, ফুটপাতের অস্থায়ী বাজার, গার্মেন্টসের ঝুট কাপড়, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি এবং প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে যুবলীগ নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পিসহ অজ্ঞাতনামা ৬/৭ জনের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংয়ের মামলা দায়ের করেছে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট।
আজ শুক্রবার সকালে সিআইডির পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
সিআইডির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজধানীর পল্লবী–মিরপুর এলাকার প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাজুল (তাইজুল) চৌধুরীর (ওরফে বাপ্পি) আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং সম্পদ অর্জনের নানা তথ্য। অনুসন্ধান অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইসলাম নিজেকে ‘স্মার্ট ফ্যাশন’ নামে একটি পোশাক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে অবস্থিত ‘মেসার্স চৌধুরী অ্যান্ড খান অটোব্রিকস’ নামে একটি ইটভাটার সত্ত্বাধিকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছিলেন।
২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে তাইজুল ইসলাম চৌধুরী মোট ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৬৫ হাজার ৩৫৫ টাকা আয় করেছেন বলে দাবি করেন। তার দেওয়া তথ্য মতে, এই আয়ের উৎস হিসেবে তিনি পোশাক ব্যবসা, মাছ ব্যবসা এবং ইটভাটা পরিচালনাকে উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, এসব ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ দিয়েই তিনি বিভিন্ন স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
একই সময়ে তিনি পারিবারিক ব্যয় দেখিয়েছেন ১ কোটি ১১ লাখ ৮৩ হাজার ২৭০ টাকা। সে হিসেবে মোট আয় থেকে পারিবারিক ব্যয় বাদ দিলে তার সম্ভাব্য সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৭১ লাখ ৭৩ হাজার ৮৫ টাকা। কিন্তু সিআইডির অনুসন্ধানে তার নামে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য পাওয়া গেছে প্রায় ৪ কোটি ২৭ লাখ ২২ হাজার ৪৭১ টাকা। অর্থাৎ তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সম্পদের হিসাব মিলিয়ে দেখা যায় প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ ৪৯ হাজার ৩৮৬ টাকার উৎস তিনি দেখাতে পারেননি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে অবস্থিত ‘মেসার্স চৌধুরী অ্যান্ড খান অটোব্রিকস’ নামের ইটভাটাটি নিষিদ্ধ এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী ভাটাটি অবৈধ হওয়ায় পরিবেশ অধিদপ্তর ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর এর কার্যক্রম বন্ধের জন্য নোটিশ জারি করে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে ভাটাটির বিরুদ্ধে এক লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। তবে এসব আইনগত পদক্ষেপ সত্ত্বেও অভিযুক্ত ব্যক্তি ইটভাটা থেকে প্রায় ৪৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা আয় দেখিয়েছেন, যা নিষিদ্ধ এলাকায় অবৈধভাবে পরিচালিত ইটভাটা থেকে অর্জিত হওয়ায় অর্থটি অবৈধ।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, পল্লবী থানাধীন উত্তর সেনপাড়া এলাকায় জমি ক্রয়ের সময় তাজুল (তাইজুল) ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পি দলিলে প্রকৃত মূল্য গোপন করেছেন। দলিলে জমির মূল্য ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা দেখানো হলেও প্রকৃত মূল্য ছিল প্রায় ৫৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। ফলে প্রায় ৪৮ লাখ টাকার উৎস গোপন করার প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি। সব মিলিয়ে সিআইডির অনুসন্ধানে প্রায় ২ কোটি ৫১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৫১ টাকা অবৈধভাবে অর্জন, স্থানান্তর ও রূপান্তর করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিভিন্ন হিসাবে লেনদেন হওয়া অর্থের পরিমাণ ৫৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকারও বেশি। বর্তমানে এসব হিসাবের মধ্যে স্থিতি প্রায় ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৪৭১ টাকা আদালতের আদেশে জব্দ রয়েছে।
তাজুল (তাইজুল) ইসলাম চৌধুরী দুটি প্রতিষ্ঠানের ২০২৩ ও ২০২৪ সালের অডিট রিপোর্ট ভুয়া বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি। কারণ, যিনি এই অডিট রিপোর্ট করার দায়িত্বে ছিলেন—চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এস এম জাকারিয়া—তিনি করোনা মহামারির সময় মৃত্যুবরণ করেছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি তার নাম ও প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা ব্যবহার করে জাল অডিট রিপোর্ট তৈরি করেছেন।
