রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাতভর উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রেললাইন অবরোধ করে বিক্ষোভ, অগ্নিসংযোগ ও রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন কার্যালয়ে ভাঙচুর করেন। এতে ঢাকাগামী আন্তনগর ধূমকেতু এক্সপ্রেসের নির্ধারিত যাত্রাও ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
রোববার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে শিক্ষার্থী আইয়ুব আলীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ঘটনার পর তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের ভাষ্য, চাচাকে স্টেশন থেকে নিতে গিয়েছিলেন আইয়ুব। এ সময় স্টেশনে ইংরেজি বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে দায়িত্ব পালনরত আনসার সদস্যদের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে আইয়ুব ওই ঘটনার প্রতিবাদ করলে তাঁকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
আইয়ুবের সহপাঠী মোহাম্মদ মিজান বলেন, রেলস্টেশনে কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে রেলওয়ের কর্মচারীদের বাগ্বিতণ্ডা হচ্ছিল। পরে আইয়ুব তাঁদের পক্ষে কথা বললে তাঁকে বেধড়ক মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে রামেক হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
রেললাইন অবরোধ
শিক্ষার্থী মারধরের খবর ছড়িয়ে পড়লে রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন স্টেশন বাজার এলাকায় রেললাইনে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ ও বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। পরে রাত পৌনে ১২টার দিকে একদল শিক্ষার্থী রাজশাহী রেলস্টেশন কার্যালয়ে গিয়ে জানালার কাঁচ ও চেয়ার ভাঙচুর করেন। রাত পৌনে ১টা পর্যন্ত সেখানে ভাঙচুর চলার খবর পাওয়া যায়।
এর আগে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ‘মার্চ টু রাজশাহী রেলস্টেশন’ কর্মসূচি ঘোষণা করে স্টেশনের দিকে রওনা দেন। কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার।
বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আটকের দাবি জানান। একই সঙ্গে ট্রেন থামিয়ে রেলওয়ের কর্মকর্তাদের আটকের হুঁশিয়ারিও দেন।
সাংবাদিকদের সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, জড়িতদের অনতিবিলম্বে আটক করতে হবে। ট্রেন থামিয়ে প্রতিটি ট্রেন থেকে দুজন করে ট্রেন স্টাফ তুলব আমি। আমার ব্যাপারে যা ব্যবস্থা নেওয়ার নেবেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর এত প্রতিহিংসা কিসের, এটা দেখতে চাই।
ট্রেন চলাচলে প্রভাব
শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে ঢাকাগামী আন্তনগর ধূমকেতু এক্সপ্রেসের নির্ধারিত যাত্রা ব্যাহত হয়। রাত ১১টা ২০ মিনিটে রাজশাহী স্টেশন থেকে ট্রেনটি ছাড়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা ছেড়ে যায়নি।
এ ঘটনায় রেলওয়ে স্টেশন ও বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তৎপর হয়।
চার আরএনবি সদস্য বরখাস্ত
এরই মধ্যে শিক্ষার্থী মারধরের ঘটনায় রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। রোববার রাজশাহী রেলওয়ের চিফ কমান্ড্যান্ট মোহা. আশাবুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক দপ্তরাদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
বরখাস্ত হওয়া সদস্যরা হলেন- মো. আরিফ হোসেন, মো. রোকন উদ্দীন, মো. শফিকুল ইসলাম ও মো. শাহাদত হোসেন। তাঁদের স্টাফ নম্বর যথাক্রমে সি-৯৮৯, সি-৮৮৩, সি-১৩২১ ও সি-৬০০।
দপ্তরাদেশে বলা হয়েছে, রোববার সন্ধ্যায় রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে সংঘটিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাঁদের কমান্ড্যান্ট (সদর)-এর কাছে নিয়মিত দৈনিক হাজিরা দিতে হবে।
সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে
ঘটনার বিষয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাপরিচালক আহম্মদ হোসেন মাসুম বলেন, এ ধরনের কোনো ভায়োলেন্সের ঘটনা কাম্য নয়। আমরা এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাঠাচ্ছি। একই সঙ্গে জড়িতদের অবশ্যই অব্যাহতি দেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীদের রেললাইন অবরোধ ও রাকসুর জিএসের হুঁশিয়ারির বিষয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরে শিক্ষার্থীদের আবেগপ্রবণ হয়ে পড়া একদম স্বাভাবিক। আমি তাঁদের আইন হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানাব। আমরা আইনগতভাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
চার আরএনবি সদস্যকে সাময়িক বরখাস্তের মধ্য দিয়ে ঘটনার পর তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, শিক্ষার্থীকে মারধরের প্রকৃত কারণ, কারা ঘটনায় সরাসরি জড়িত এবং স্টেশনে ভাঙচুর ও রেললাইন অবরোধের ঘটনায় কারা জড়িত, এসব বিষয়ে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া এখনো চলমান।
