কুমিল্লার দেবিদ্বারের ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তিন রোহিঙ্গা নাগরিককে জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়ার অভিযোগে সাবেক ইউপি প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) মো. নজরুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।
তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জন্মনিবন্ধন পাওয়া ওই তিনজনসহ আরও কয়েকজনকে রোহিঙ্গা দাবি করা হলেও তাদের পারিবারিক শিকড় কক্সবাজারে এবং তারা বাংলাদেশের নাগরিক বলে দাবি করেছেন স্বজন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয়ে জন্মনিবন্ধন দেওয়ার অভিযোগটি নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
জানা যায়, উপজেলা ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মিয়ানমারের তিন রোহিঙ্গা নাগরিককে জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়ার অভিযোগ উঠলে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়। এর মধ্যে একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের সূত্র ধরে অভিযোগটি আরও জোরালো হয়। এসব অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে রোহিঙ্গাদের জন্মনিবন্ধনের খবর প্রকাশিত হলে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন তদন্তে নামলে ওই তিন ব্যক্তির ফতেহাবাদ ইউনিয়নে বসবাসের তথ্য না পাওয়ায় সাবেক ইউপি প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) মো. নজরুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
জন্মসনদে উল্লেখিত তিন ব্যক্তি হলেন- মুবিনা খাতুন, হাফিছা এবং সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদ। এ ছাড়াও অন্য একটি অভিযোগেও জন্মনিবন্ধন পাওয়া আবু হেনা সিদ্দিকী ইশমাম, জুনাইরা আফরিন আঁখি, নূর মামিন, মাজেদকে রোহিঙ্গা দাবি করা হলেও অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন তথ্য। তারা কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা বলে দাবি করেন তাদের স্বজন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তারা কেউই মিয়ানমারের নাগরিক নন বলে জানান।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হওয়া গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদনের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সত্যতাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তা ছাড়া অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি জন্মসনদের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগকারী শফিউল আলমের।
মুবিনা খাতুনের মা নুরজাহান বেগম বলেন, আমার সাবেক স্বামী আবুল কাশেম অনেক বছর আগে মারা গেছেন। আমার মেয়ে মুবিনাও সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আমরা মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা নই। আমার জন্ম কক্সবাজার সদরে। আমার বাবা-ভাই সবাই এ দেশের নাগরিক। আমার মেয়েও জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক।
কক্সবাজার সদর উপজেলার ভারুয়াখালী ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুরুল আমিন কাজল বলেন, হাফিছা, আবু হেনা সিদ্দিকী ইশমাম, জুনাইরা আফরিন আঁখি, আমার প্রতিবেশী। ওরা আমার ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা। চেয়ারম্যান না থাকায় এলাকায় সাধারণ নাগরিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ কারণে অনেকে বাধ্য হয়ে অন্য এলাকা থেকে নাগরিক সনদ বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে সমস্যার সমাধান করছেন।
সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদের বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার ছেলে আবুধাবিতে থাকে। জরুরি প্রয়োজনে ডিজিটাল জন্মসনদ প্রয়োজন হওয়ায় সে পরিচিত একজনের মাধ্যমে জন্মসনদ তৈরি করে। আমরা মিয়ানমারের নাগরিক নই। আমাদের পূর্বপুরুষ জন্মসূত্রে মহেশখালীতে বসবাস আমরা বাংলাদেশের নাগরিক।
ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ডিজিটাল সেন্টারের সাবেক উদ্যোক্তা আসাদুজ্জামান রাজিব আমাকে জিম্মি করে জোরপূর্বক আমার কাছ থেকে কাজ করিয়ে নিত, আমি ছুটিতে থাকাকালীন রাজির নাগরিকদের সমস্যার কথা বলে বিভিন্ন সময় আমার কাছ থেকে ওটিপি নিয়ে বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের জন্মসনদ দেয়, যা পরে আমি জানতে পারি। আমি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চাই এবং আইন অনুযায়ী তার শাস্তির দাবি করি।
সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সালাহ উদ্দিন রুহুল কালবেলাকে বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে আমি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করলেও জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনার ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড পাই ২০ জানুয়ারি ২০২৫ সালে। অথচ আলোচিত জন্মনিবন্ধনগুলো তৈরি হয়েছে ৪ জানুয়ারি ২০২৫। অর্থাৎ আমি ইউজার এক্সেস পাওয়ার আগেই এগুলো তৈরি করা হয়েছে। কারা, কীভাবে এবং কোন আইডি ব্যবহার করে এসব জন্মনিবন্ধন করেছে, তা আমার জানা নেই।
এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মিস রোজি আক্তার কালবেলাকে বলেন, ইস্যু করা জন্মনিবন্ধন সনদ কোনো রোহিঙ্গাকে দেওয়া হয়েছে কি না তা তদন্ত চলছে, তদন্তে অপরাধী প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
