সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভবিষ্যৎ কী?

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৪২ এএম

নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হওয়ার দিনেই রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দিল অপ্রত্যাশিত টানাপোড়েন। কেন্দ্রবিন্দুতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ-যে পরিষদ গঠনের প্রশ্নে ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট প্রকাশ্য অবস্থানগত বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে। শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে সাংবিধানিক ব্যাখ্যা, গণভোটের ম্যান্ডেট এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার-এই তিনের জটিল সমীকরণ।

সংসদ সচিবালয় মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) একই দিনে দুটি পৃথক শপথের প্রস্তুতি নেয়- একটি সংসদ সদস্য হিসেবে, অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। কিন্তু বিএনপির নবনির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। স্বতন্ত্র ৭ সদস্যও একই পথ অনুসরণ করেন। অন্যদিকে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলনের ৭৮ জন সদস্য পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ গ্রহণ করেন। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।

বিএনপির যুক্তি স্পষ্ট- সংবিধানে এখনও পরিষদের বিধান সংযোজিত হয়নি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ দলীয় এমপিদের উদ্দেশে বলেন, পরিষদ সংবিধানে ধারণ না হওয়া পর্যন্ত এবং কে শপথ পড়াবেন- এ সংক্রান্ত বিধান না থাকা পর্যন্ত পরিষদের শপথ গ্রহণ সম্ভব নয়। তাঁর ভাষ্য, সংসদে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধান করা যেতে পারে। বিএনপি সংবিধান মেনে চলার অবস্থানে আছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রতীকী এক দৃশ্যও নজর কাড়ে- সংসদ সদস্যের শপথপত্র ছিল সাদা কাগজে, আর পরিষদের শপথপত্র নীল কাগজে। বিএনপির সদস্যরা নীল কাগজটি চেয়ারে রেখেই কক্ষ ত্যাগ করেন।

বিরোধী জোটের দাবি, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় পরিষদ গঠন ও শপথ গ্রহণ বাধ্যতামূলক। গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৬৮ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নবনির্বাচিত এমপিরা ১৮০ কার্যদিবসের জন্য পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন এবং ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের সভা আহ্বান করতে হবে।

জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহেরের বক্তব্য ঘিরে প্রথমে গুঞ্জন ওঠে যে বিএনপি শপথ না নেওয়ায় বিরোধী জোটও নাকি শপথ নেবে না। তবে তিনি তা নাকচ করে জানান, জোটের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে- দুটি শপথই নেওয়া হবে। তার ভাষ্যে, বিএনপি পরিষদের শপথ না নিয়ে জুলাই আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে এবং গণভোটের রায়কে অসম্মান করেছে।

এনসিপি বিএনপির অবস্থানের প্রতিবাদে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বয়কট করে। দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, গণভোটে জনরায়ের সঙ্গে প্রতারণা করে সরকার শপথ নিচ্ছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ প্রশ্ন তোলেন- দুটি শপথ না নিলে সংসদে যাওয়ার অর্থ কী? ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রথম দিনেই জনরায় উপেক্ষার খারাপ দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে।’

এদিকে গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের হয়েছে। জামায়াতের একাধিক নেতার সন্দেহ, এতে বিএনপির সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। ফলে রাজনৈতিক বিরোধ এখন আইনি পরিসরেও বিস্তৃত হয়েছে। আদালতের রায় এই অচলাবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সংস্কার প্রস্তাবের ভেতরের বিভাজন

জুলাই সনদে মোট ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ১৩টিতে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ এবং সাতটিতে জামায়াতের আপত্তি ছিল। বিএনপির অবস্থান ছিল- যেসব প্রস্তাবে তারা আপত্তি জানিয়েছে, নির্বাচনে জয়ী হলে সেগুলো নিজেদের নোট অনুযায়ী বাস্তবায়ন করবে। অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপি জোট চেয়েছে সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন।

গণভোটের ব্যালটে প্রস্তাবগুলো ৪ ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথম ভাগে ছিল নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি), মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি), ন্যায়পাল এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গঠন ও নিয়োগ সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার প্রশ্ন। দ্বিতীয় ভাগে ছিল উচ্চকক্ষ গঠন ও তার ক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাব। তৃতীয় ভাগে ছিল ৩০টি সর্বসম্মত সংস্কার প্রস্তাব, যা ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় বাধ্যতামূলক। শেষ ভাগের ১০টি প্রস্তাব বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক নয়।

উচ্চকক্ষের ক্ষেত্রে বিএনপি ১০০ আসনের কাঠামোয় একমত হলেও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি ও সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় ওই আপত্তিগুলো কার্যকর থাকবে কি না- সেই প্রশ্নও এখন আলোচনায়।

আদেশের ১০(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পরিষদের কোরাম হবে ৬০ সদস্যের উপস্থিতিতে। বর্তমানে জামায়াত জোটসহ ৭৮ জন সদস্য শপথ নিয়েছেন। বিএনপি যোগ না দিলেও কোরাম পূরণ সম্ভব- তবে রাজনৈতিক বৈধতা ও সর্বদলীয় অংশগ্রহণের প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

সাবেক ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, জনগণের সার্বভৌম অভিপ্রায়ে জারি হওয়া আদেশ গণভোটে অনুমোদিত হয়েছে। আদেশের ৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এমপিদের পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা। শপথ না নেওয়ার মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা তৈরি হয়েছে।

সমঝোতা না সংঘাত?

প্রথম দিনেই যে বিভাজনরেখা স্পষ্ট হয়েছে, তা কেবল শপথ-সংক্রান্ত প্রক্রিয়াগত বিতর্ক নয়; বরং জুলাই সনদের ব্যাখ্যা, গণভোটের বাধ্যবাধকতা এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অগ্রাধিকার-এই তিনের সংঘাতে রূপ নিয়েছে।

পরিষদের সভা ৩০ দিনের মধ্যে আহ্বানের বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন ডাকবেন, সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই পরিষদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন সামনে আসবে। বিএনপি যদি অবস্থান অপরিবর্তিত রাখে, তবে পরিষদ একতরফাভাবে এগোবে কি না—সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে রাজনৈতিক উত্তরণ সহযোগিতামূলক হবে, নাকি সংঘাতময়।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর