ভোলায় গ্রেফতার হওয়া আলোচিত জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মী বিবি সাওদা (৩৭) জামিনে মুক্ত হয়ে বলেছেন, সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় গিয়েছে। তারা যদি জনগণের না হয় তাহলে আমরা সেই সরকার দিয়ে কী করব? সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে আমার অসুস্থ সন্তানকে রেখে বহু কষ্টে দুই রাত জেলখানায় কাটাতে হয়েছে এবং অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা চাই সামনের দিনগুলোতে অন্তত আমাদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হোক। আমরা যেন আমাদের মতামত তুলে ধরতে পারি এটাই চাই। আমি আমার দেশ ও জনগণকে ভালোবেসেই ফেসবুকে পোস্ট করেছি। এখন কথা বলার অপরাধে যদি জনে জনে ধরে নিয়ে জেলে ভরে দেয় তাহলে সামনের দিকে কেউ কথা বলবে না। তাহলে কী আমরা আগামী দিনেও জেলের মধ্যেই থাকব? ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পরও যদি সবাই চুপ করে থাকি তাহলে লাভ হলো কী? অন্তত আমাদের বাক-স্বাধীনতা কেড়ে না নেওয়া হোক।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দুপুরে ভোলার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সৌরভ রায় মিঠুর আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে আদালত প্রাঙ্গণে তিনি তার এসব ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
আদালতে সাওদার পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন, অ্যাডভোকেট ফরিদুর রহমান, অ্যাডভোকেট আরিফুর রহমান, অ্যাডভোকেট জিয়াউর রহমান, রহমাতুল্লাহ সেলিমসহ আইনজীবীদের একটি দল।
এর আগে বিবি সাওদাকে পুলিশ গ্রেফতারের ঘটনাটি জানাজানির পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার জন্ম দেয়; যা গড়ায় মহান জাতীয় সংসদ পর্যন্ত এবং অতিদ্রুত তাকে মুক্তির দাবি জানানো হয়। পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হওয়ার পর আদালত প্রাঙ্গণে গলায় ফুলের মালা পড়িয়ে তাকে বরণ করেন জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা।
ভোলা আদালতের পুলিশ পরিদর্শক শেখ মো. নাছির উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আদালত বিবি সাওদাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছেন। ৫৪ ধারায় তাকে আদালতে হাজির করা হয়েছিল।
এদিকে নিজেদের কর্মী জামিনে মুক্ত হওয়ার পর তাকে গ্রেফতারের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন জামায়াতে ইসলামীর ভোলা জেলা সেক্রেটারি কাজী মাওলানা হারুনুর রশিদ।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, সাওদাকে গ্রেফতার করে সরকার সারা দেশের নারী-পুরুষের মধ্যে একটি ভীতি সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। যাতে করে সরকারের বিরুদ্ধে কেউ সমালোচনা না করেন এবং যারাই সমালোচনা করবে তাদের টুঁটি এভাবে (সাওদার মতো) চেপে ধরবে। আমরা মনে করি সরকার যে উদ্যোগ নিতে চেয়েছিল সেটি ব্যর্থ হয়েছে। জামায়াতের নারী কর্মী সাওদাকে গ্রেফতারের ঘটনাটি ছিল সাজানো নাটক।
আমরা আইনগতভাবে এগিয়েছি এবং আদালত তাকে জামিন দিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে গত রোববার (৫ এপ্রিল) দিনগত রাতে ভোলা সদর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আদর্শ একাডেমির রোডের ক্ষণিকালয় নামে নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি ওই একই এলাকার আব্দুল হালিম বাবুলের স্ত্রী। পরবর্তীতে সোমবার (৬ এপ্রিল) তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠায় পুলিশ।
এদিকে মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দুপুরে এ ঘটনায় প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে ভোলার পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ কাওছার।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিবি সাওদা তার ফেসবুক আইডিতে সরকার রাজনীতি, রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের (প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের অসত্য ও বিভ্রান্তিকর পোস্ট করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন। পরবর্তীতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে ভোলা জেলা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল (গোয়েন্দা শাখা) এবং তার মোবাইলটি জব্দ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ফেসবুক পোস্টের সত্যতা স্বীকার করেন।
তিনি বলেন, বিবি সাওদা সাইবার সুরক্ষা নেট অধ্যাদেশ ২০২৫-এ শাস্তিযোগ্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত। এছাড়া তার মোবাইল ফোন ফেসবুক পোস্টসমূহ পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ তাৎক্ষণিক সম্ভব না হওয়ায় তাকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় আদালতে সোপর্দ করা হয়।
ভোলার পুলিশ সুপার আরও জানান, সাওদার মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা করে অপরাধের ধরণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য আদালতের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে আলামতের ফরেনসিক রিপোর্ট প্রাপ্তি সাপেক্ষে আদালতকে বিস্তারিত প্রতিবেদন আকারে উপস্থাপন করা হবে।
এদিকে গ্রেফতারের আগে সর্বশেষ বিবি সাওদা তার ব্যবহৃত ফেসবুক আইডিতে ‘Sawoda Sumi’ দেওয়া পোস্টে লেখেন- ‘আমরা তো চাইলে ইরান থেকে তেল আনতে পারি তারা তো অনুমতি দিছে’, ‘তাহলে দুই তিন গুণ বেশি টাকা দিয়ে কেন ভারত থেকে তেল আনা লাগবে?’। তিনি অন্যান্য পোস্টেও জ্বালানি তেল সংকট নিয়ে সরকারের সমালোচনা করে পোস্ট দিতে দেখা গেছে এবং যা ফেসবুকে ভাইরাল হয়।
