ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে যখন মানবসভ্যতা অস্তিত্বের হুমকির মুখে পড়েছে, তখন কিছু মানুষ আবির্ভূত হয়েছেন যাঁরা দৃঢ় বিশ্বাস, অসাধারণ সাহস ও ঐশ্বরিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে মানবসমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরিয়ে এনেছেন পুনর্জাগরণের পথে। এই মানুষগুলো কেউ বিপ্লবী, কেউ সংস্কারক, কেউ আবার ইতিহাসের কঠিন সময়ে উঠে আসা রাষ্ট্রনায়ক। বাংলাদেশের ইতিহাসেও তেমনই এক অনন্য নাম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬ সালে বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার নশিপুর ইউনিয়নের বাগবাড়ি গ্রামের সম্ভ্রান্ত মণ্ডল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এক নবজাতক নাম রাখা হয় কমল। পিতা ছিলেন রসায়নবিদ জনাব মনসুর রহমান এবং মাতা জনাবা জাহানারা খাতুন। সময়ের পরিক্রমায় এই কমলই হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান।
জিয়াউর রহমানের মূল পূর্বপৈত্রিক নিবাস বগুড়ার মহিষাবান গ্রামে। দাদার বিয়ের পর পরিবারটি বাগবাড়ি গ্রামে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে। গাবতলী, সুখানপুকুর ও যমুনার পশ্চিম তীরবর্তী অঞ্চলের প্রখ্যাত নেতা মুমিন উদ্দিন মণ্ডল মহিষাবানী (মৃ. ১৮৪০) এবং তাঁর তৃতীয় অধঃস্তন সন্তান কাঁকর মণ্ডল সাহেবের সরাসরি বংশধর ছিলেন জিয়াউর রহমান। তাঁর দাদা মৌলবী কামালুদ্দীন মণ্ডল (জন্ম ১৮৫৪) ছিলেন কাঁকর মণ্ডল সাহেবের একমাত্র পুত্র এবং বাগবাড়ি মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক যিনি শিক্ষা ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
শৈশবের শুরু বগুড়ার গ্রামেই। বগুড়া জিলা স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি। এরপর কিছু সময় কলকাতা নগরীতে অবস্থান করেন। ভারতবর্ষ বিভক্তির পর তাঁর পিতা করাচিতে চলে গেলে জিয়াউর রহমান কলকাতার হেয়ার স্কুল ত্যাগ করে করাচি একাডেমি স্কুলে ভর্তি হন। সেখান থেকেই তিনি ১৯৫২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন।
পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালে করাচির ডি.জে. কলেজে ভর্তি হন। শিক্ষাজীবনে উর্দু ও ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণের ফলে তিনি কথ্য বাংলায় সাবলীল হলেও লিখিত বাংলায় শুরুতে দুর্বল ছিলেন। তবে আত্মসংযম, অধ্যবসায় ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন। একই বছর তিনি কাকুল মিলিটারি একাডেমিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। এখান থেকেই শুরু হয় এক পেশাদার, সৎ ও সাহসী সৈনিক জীবনের অধ্যায়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তিনি ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের সূচনা করেন। রণাঙ্গনে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তাঁর নেতৃত্ব, সাহস ও কৌশল মুক্তিযুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তিকে সুসংহত করে। এই সময়েই তিনি কেবল একজন সেনা কর্মকর্তা নন একজন জনগণের নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যখন বাংলাদেশ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত, তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তার সূচনা করেন। তিনি উপস্থাপন করেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ যা ভৌগলিক, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জনগণের সম্মিলিত পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় ভিত্তিতে রূপ দেয়।
একদলীয় শাসনব্যবস্থার বিপরীতে তিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন বহুদলীয় গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ। তাঁর শাসনামলে সাধারণ মানুষ নতুন করে কথা বলার, সংগঠিত হওয়ার ও অংশগ্রহণের সাহস ফিরে পায়।
‘উৎপাদন বৃদ্ধি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও স্বনির্ভরতা’ এই ত্রিসূত্র ছিল তাঁর উন্নয়ন দর্শনের ভিত্তি। কৃষি, শিল্প, গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন ও প্রবাসী শ্রমবাজার সম্প্রসারণে তাঁর উদ্যোগ আজকের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত রচনা করেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষকে ক্ষমতায়িত না করলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় না।
জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিজীবন ছিল অসাধারণ রকমের সাদামাটা। রাষ্ট্রপতির পদে থেকেও তিনি অপচয়, বিলাস ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে ছিলেন আপসহীন। কাছ থেকে দেখা মানুষের স্মৃতিতে উঠে এসেছে এই অনন্য নৈতিকতা রাষ্ট্রীয় সফরে বিলের টাকা কম পড়লে সাংবাদিকের কাছ থেকে ধার নিয়ে পরে শোধ করা, রাষ্ট্রপতি ভবনে সাধারণ লেবু চা ও বিস্কুটে আপ্যায়ন, নিজের নাশতা অতিথিকে দিয়ে নিজে প্রায় না খাওয়া, নিজের ভাই বা শ্যালকের ক্ষেত্রেও নিয়মভঙ্গ মেনে না নেওয়া। এই ঘটনাগুলো কোনো কাহিনি নয় এগুলো একজন রাষ্ট্রনায়কের চরিত্র দলিল।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে নির্মম হত্যাকাণ্ডে তিনি শহীদ হন। তবে মৃত্যুর মধ্য দিয়েও তিনি হারিয়ে যাননি। তাঁর আদর্শ, রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আজও বহমান। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাঁর সেই গণতান্ত্রিক ও জনমুখী দর্শনের ধারক হয়ে আছে।
এমন রাষ্ট্রনায়ক নিয়ে গর্ব করতেও কি আমাদের লজ্জা লাগে? আজ ১৯ জানুয়ারি এই দেশপ্রেমিক, বগুড়ার কমলের জন্মদিন (জন্ম: ১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬)। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কেবল একটি নাম নন; তিনি এক মূল্যবোধ, এক রাজনৈতিক নৈতিকতা এবং এক আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের প্রতীক। তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে গণতন্ত্র, সততা ও দেশপ্রেমের অঙ্গীকার নতুন করে উচ্চারণ করা।
শুভ জন্মদিন বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।
ডাঃ এ, কে, এম আহসান হাবীব নাফি
চিকিৎক ও রাজনৈ্তিক কর্মী