প্রশাসনের হস্তক্ষেপে অবশেষে নওগাঁয় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাস শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনার অবসান। তাদের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের জেরে টানা ৭৯ ঘণ্টা বাস চলাচল বন্ধ থাকার পর নওগাঁয় অভ্যন্তরীণ ও কয়েকটি আন্তজেলা রুটে বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল শুরু হয়েছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুর দেড়টার দিকে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দুপক্ষের সমঝোতা হলে যান চলাচল শুরু হয়। দীর্ঘ প্রায় ৭৯ ঘণ্টা পর যান চলাচল শুরু হলেও সাধারণ যাত্রীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে এই যান চলাচল বন্ধ থাকার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু ছোট যান চালক সাধারণ যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বাধ্য হয়ে দ্বিগুণ বা তার চেয়েও বেশি ভাড়া দিয়ে রিকশা, ভ্যান বা বিভিন্ন বিকল্প উপায়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে যাত্রীদের।
মান্দাগামী যাত্রী আরিফ হোসেন বলেন, ‘প্রশাসনের সমঝোতায় গাড়ি চলাচল তো শুরু হলো, কিন্তু এই কয়েকদিনের ভোগান্তির দায় কে নেবে? সংঘর্ষ হলো কার সঙ্গে আর কষ্ট ভোগ করতে হলো সাধারণ যাত্রীদের। সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা কেউ ভাবে না।’
সাপাহারগামী যাত্রী তুলি কাজী বলেন, ‘সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে এভাবে সাধারন মানুষকে জিম্মি করে ফেলা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের অমানবিক অচলাবস্থা এড়াতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।’
আদালতে হাজিরা দিতে আসা পোরশার তারিক হোসেন বলেন, ‘তিন দফায় ভেঙে ভেঙে বিকল্প যানবাহনে আসায় অতিরিক্ত ১৫০ টাকা বেশি ভাড়া গুনতে হয়েছে, সেই সঙ্গে সময়ও নষ্ট হয়েছে প্রচুর।’
বাস ও অটোরিকশা মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত শনিবার বেলা ১১টার দিকে নওগাঁ শহরের বালুডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে যাত্রী ওঠানোকে কেন্দ্র করে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক এবং একটি বাসের চালক ও সহকারীর বাগ্বিতণ্ডা হয়। এর জেরে বেলা ১টার দিকে পত্নীতলার নজিপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোচালকেরা সংঘবদ্ধ হয়ে বাসচালক রুবেল হোসেন ও তার সহকারীকে মারধর করেন।
এই ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন রোববার সকাল থেকে নওগাঁ থেকে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট ও বগুড়া রুটে বাস চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন। বাস বন্ধ রাখার পাশাপাশি বাসশ্রমিকেরা সড়কে অটোরিকশা চলাচলও আটকে দেন। এমনকি বাসশ্রমিকদের বাধা উপেক্ষা করে যেসব অটোচালক সড়কে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করেছেন, তাদের ওপরও হামলার অভিযোগ ওঠে।
গত সোমবার রাতে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর অভ্যন্তরীণ রুটে বাস চালুর ঘোষণা দেওয়া হলেও তা টেকেনি দুই ঘণ্টাও। মঙ্গলবার সকালে বদলগাছীতে একটি যাত্রীবাহী বাস গেলে অটোরিকশার চালকেরা আবারও বাসচালকের ওপর হামলা অভিযোগ তোলে তাৎক্ষণিকভাবে ফের বন্ধ করে দেওয়া হয় বাস চলাচল।
যান চলাচল বন্ধ হওয়ার পর থেকে দফায় দফায় পরিবহন শ্রমিক নেতা, অটোরিকশা মালিক-চালক সমিতি এবং স্থানীয় প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অবশেষে উভয় পক্ষের সমঝোতায় বুধবার দুপুর দেড়টা থেকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
নওগাঁ জেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এই আন্দোলনে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নাই। এটি শ্রমিকদের আন্দোলন ছিল। তাদের যে দাবিগুলো ছিলো, তারা প্রশাসনের কাছে লিখিত চেয়েছিলো। প্রশাসন তাদের দাবি লিখিত দিয়েছে; এখন শ্রমিকরা গাড়ি চালাচ্ছে।
এ বিষয়ে নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মাসুদুল হক বলেন, শ্রমিকদের নির্দিষ্ট দাবি ও শর্ত সাপেক্ষে যান চলাচল শুরু হয়েছে। যাত্রী ওঠানামার ক্ষেত্রে দুপক্ষের মধ্যে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া নির্দিষ্ট দূরত্বে সিএনজি ও বাস স্টেশন থাকবে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা নির্দিষ্ট সময় মেনে চলাচল করবে এবং ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, তাদের অভ্যন্তরীণ কিছু দ্বন্দ্বের কারণে যান চলাচল স্বাভাবিক হচ্ছিল না। দফায় দফায় উভয় পক্ষের সাথে আলোচনা করে এবং উভয় পক্ষের কিছু দাবি পূরণের করা হয়েছে, পাশাপাশি উভয় পক্ষকে কিছু শর্ত মেনে চলতে বলা হয়েছে। যার ফলে সব যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।
