সিলেটের শাহজালাল ফার্টিলাইজার প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দ করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া বিল ও রসিদ দাখিল করে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) শাহজালাল ফার্টিলাইজার প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় এসব সম্পদ জব্দ করা হয়।
সিআইডির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শাহজালাল ফার্টিলাইজারের সাবেক হিসাব বিভাগের প্রধান খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল নিজের নামে এবং স্ত্রী হালিমা আক্তারের নামে অর্জিত অর্থে জমি, জমির শেয়ার, ফ্ল্যাট ও ব্যাংকে অর্থ জমা রেখেছিলেন। এসব সম্পদের আনুমানিক বাজারমূল্য কমপক্ষে ২৫ কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জব্দকৃত সম্পদের মধ্যে রয়েছে মোট ২৩ দশমিক ৫ কাঠা জমি, ১১টি শেয়ার—যার সম্মিলিত জমির পরিমাণ ৩৯২ দশমিক ৭৩২৩ অযুতাংশ। পাশাপাশি ১২টি ফ্ল্যাট জব্দ করা হয়েছে, যেগুলোর দলিলমূল্য ৮ কোটি ৪৭ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯০ টাকা হলেও বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা। আদালতের নির্দেশে তিনটি ব্যাংক হিসাবে থাকা মোট ৩০ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫২ টাকাও জব্দ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় অনুসন্ধান শেষে সিআইডি বাদী হয়ে ২০২৩ সালের ২৬ এপ্রিল মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করে। মামলার তদন্তে জানা যায়, ২০০৫ সালে বিসিআইসির শাহজালাল সার কারখানা প্রকল্পে সহকারী হিসাবরক্ষক হিসেবে যোগ দেন খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল। সময়ের সঙ্গে পদোন্নতি পেয়ে তিনি হিসাব বিভাগের প্রধান হন। ১৪ বছরের চাকরি জীবনে তিনি মোট ৯১টি গাড়ি, ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, দুটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরসহ ঢাকা, গাজীপুর ও অন্যান্য এলাকায় বিপুল সম্পদের মালিক হন। অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে পাঁচ বছর আগে তাকে কারখানা থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ২০২২ সালের জুন মাসে ইকবাল ও তার স্ত্রী হালিমা আক্তারকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তখন অস্ত্র ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তী সময়ে র্যাবের অভিযোগের ভিত্তিতে সিআইডি মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত অনুসন্ধান শুরু করে এবং অনুসন্ধান শেষে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা রুজু করে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া বিল ও রসিদ দাখিল করে বিসিআইসির শাহজালাল ফার্টিলাইজার প্রকল্প থেকে ৩৮ কোটি ৮৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৫১ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এসব ভুয়া বিল ও রসিদ তৈরি করা হয় তার স্ত্রী হালিমা আক্তারের মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠান—টিআই ইন্টারন্যাশনাল ও নুসরাত ট্রেডার্সের নামে। স্ত্রীর নামে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান খুলে পরিকল্পিত জালিয়াতির মাধ্যমে ওই অর্থ তুলে নেওয়ার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। একই ঘটনায় পৃথকভাবে ২৬টি মামলার তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
তদন্তকালীন সময়ে আরও যেসব সম্পদ জব্দ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ঢাকার রমনা ও এয়ারপোর্ট এলাকায় ছয়টি ফ্ল্যাট এবং ঢাকা, গাজীপুর ও ময়মনসিংহে মোট ৩০৪ শতাংশ জমি, যার দলিলমূল্য ৭ কোটি ১১ লাখ টাকার বেশি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ৯১টি গাড়ির নিবন্ধন রয়েছে। এর মধ্যে ২১টি মিনিবাস ও দুটি হাইচ জব্দ করা হয়েছে।
বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে ২১টি মিনিবাসের রিসিভার হিসেবে অতিরিক্ত আইজিপি, সিআইডি, ঢাকা নিযুক্ত থাকায় এসব যানবাহন বর্তমানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ভাড়ায় ব্যবহৃত হচ্ছে। ভাড়ায় পরিচালিত এসব গাড়ি থেকে এ পর্যন্ত ৫৩ লাখ ৮০ হাজার ৩৩৫ টাকা আয় হয়েছে, যা আদালতের অনুমোদনে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট মামলাটির তদন্ত পরিচালনা করছে। অপরাধের পূর্ণাঙ্গ চিত্র উদ্ঘাটন, সংশ্লিষ্ট অজ্ঞাত ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং অন্যান্য আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পন্নের লক্ষ্যে সিআইডির অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
