ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ট্রাফিক বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক অভিযোগ ওঠার পরও এখনো বহাল রয়েছেন ট্রাফিক পুলিশ ইনচার্জ মীর আনোয়ার হোসেন। অভিযোগের পাহাড়, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ এবং পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের তদন্ত চলমান থাকার পরও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন।
জেলা জুড়ে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়
জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মহাসড়ক, বাস-মিনিবাস কাউন্টার, সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ড সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটাই নাম: ট্রাফিক ইনচার্জ মীর আনোয়ার। পরিবহন শ্রমিক, মালিক সমিতির সদস্য, সিএনজি চালক থেকে শুরু করে সচেতন নাগরিকদের মাঝেও চলছে তীব্র সমালোচনা।
অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতার পরিবর্তে গড়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, যার মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা আদায় ও হয়রানিমূলক আচরণ করা হচ্ছে। অভিযোগের পাহাড়, তবুও বহাল তবিয়তে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, ট্রাফিক আইন প্রয়োগের নামে চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম ভঙ্গ না করলেও জরিমানা ও মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।
একাধিক পরিবহন শ্রমিক নেতা দাবি করেন, “ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এখন জনস্বার্থের বদলে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।”
গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ, তবুও বেপরোয়া আচরণের অভিযোগ গত ২১ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একাধিক দৈনিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ট্রাফিক ইনচার্জ মীর আনোয়ার হোসেন ও তার অধীনস্থ সার্জেন্ট ফরিদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সংবলিত সংবাদ প্রকাশিত হয়। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব সংবাদ প্রকাশের পর পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার পরিবর্তে উল্টো আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সিএনজি চালক বলেন, “সংবাদ হওয়ার পর আমরা ভেবেছিলাম হয়তো অবস্থা কিছুটা ভালো হবে। কিন্তু এখন আগের চেয়ে চাপ বেশি। কেউ মুখ খুললেই ভয় দেখানো হচ্ছে। এত অভিযোগ, এত আলোচনা ও সংবাদ প্রকাশের পরও কেন মীর আনোয়ার এখনো একই পদে বহালএ নিয়ে সর্বত্র প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় পরিবহন শ্রমিকদের একাংশের দাবি, জেলা পরিবহন মালিক সমিতির একটি প্রভাবশালী অংশ এবং কিছু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো পক্ষই প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) এম এম রকীব উর রাজা বলেন, “ট্রাফিক ইনচার্জ মীর আনোয়ার হোসেন ও সার্জেন্ট ফরিদের বিরুদ্ধে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে প্রাপ্ত একটি অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়।”
তিনি আরও জানান,“তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তদন্ত চলাকালীন দায়িত্ব পালন—স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
তবে পুলিশের এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন সাধারণ শ্রমিকরা ও সচেতন মহল। তাদের প্রশ্ন—তদন্ত চলাকালীন একজন গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তা কীভাবে একই পদে থেকে দায়িত্ব পালন করছেন?
“যদি অভিযোগ গুরুতর হয় এবং তা জনস্বার্থের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে দায়িত্বে রেখে তদন্ত করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে প্রমাণ প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।”
এদিকে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও হয়রানিমূলক আচরণে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও সাধারণ পথচারীরা।অনেকেই অভিযোগ করছেন, ট্রাফিক পুলিশের আচরণ অনেক সময় অমানবিক ও অসৌজন্যমূলক, যা পুলিশের প্রতি জনআস্থা ক্ষুণ্ন করছে। সবশেষে জনমনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে তদন্ত শেষ হতে কত সময় লাগবে?
তদন্ত চলাকালীন কেন অভিযুক্ত কর্মকর্তারা বহাল থাকবেন? ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সচেতন মহলের মতে, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে পুলিশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং জনআস্থা আরও কমে যাবে। এখন দেখার বিষয়—তদন্ত শেষে সত্যিই কি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, নাকি ‘খুঁটির জোরে’ সব অভিযোগ ধামাচাপা পড়ে যাবে?
এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অ্যাডিশনাল এসপি ওবায়দুর রহমান বলেন, দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দেয়া হবে।
