জাতিসংঘ প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফর স্থগিত

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৪১ পিএম

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ বিষয়ক জাতিসংঘের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফর আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও পঞ্চম এলডিসি সম্মেলনের মহাসচিব রাবাব ফাতিমা। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বর্তমানে এই সফর না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী মাসে নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশ সফরে আসতে পারে। নতুন কোনো তারিখ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

জাতিসংঘের এই প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশের এলডিসি-উত্তরণের সার্বিক প্রস্তুতি পর্যালোচনা এবং অবস্থান মূল্যায়নের জন্য আসার কথা ছিল। একই সঙ্গে ২১ জানুয়ারি এলডিসি-উত্তরণ নিয়ে একটি স্বাধীন প্রস্তুতিমূলক মূল্যায়ন প্রতিবেদন উপস্থাপনেরও কর্মসূচি ছিল।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, এলডিসি থেকে উত্তরণের সম্ভাব্য প্রভাব এবং উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নের পথনকশা তৈরির লক্ষ্যে গত নভেম্বরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার কাছ থেকে মতামত ও নথিপত্র সংগ্রহ করে জাতিসংঘ। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত প্রস্তুতি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, ঢাকা সফর স্থগিত হলেও নির্ধারিত সময়েই এই মূল্যায়ন প্রতিবেদন বাংলাদেশে পাঠানো হবে।

এ বিষয়ে বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, জাতিসংঘ এ দফায় আসছে না মানে পরে আসবে। তবে তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদনটা আমরা পেয়ে যাব। এরপর বাকি প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে এগোবে।

এদিকে, এলডিসি থেকে উত্তরণ পেছানোর দাবিতে অনড় অবস্থান নিয়ে আসছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই), বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ), ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ (আইসিসিবি)সহ ১৬টি শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন গত ২৪ আগস্ট একযোগে সংবাদ সম্মেলন করে এই দাবি জানায়। সরকার ইতিমধ্যে জাতিসংঘকে এই দাবির কথা জানিয়েছে। তবে উত্তরণ পেছানোর বিষয়ে জাতিসংঘের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।

ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এলডিসি থেকে বের হলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত বাণিজ্যসুবিধা আর থাকবে না। এতে দেশের রপ্তানি ৬ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এলডিসি উত্তরণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ইতিবাচক নয়। আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশের যেকোনো একটি দেশ বিরোধিতা করলে সেটিকে সম্মিলিত বিরোধিতা হিসেবে গণ্য করা হয়।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বলে আসছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ ২০২৬ সালেই হবে। তিনি জানান, উত্তরণ পেছানোর আবেদন অন্তর্বর্তী সরকার করবে না; নির্বাচিত সরকার চাইলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, তারা (জাতিসংঘ প্রতিনিধিদল) প্রস্তাব দিয়েছিল উপদেষ্টা পরিষদসহ বড় সম্মেলন করার। আমরা বলেছি, সামনে সংসদ নির্বাচন। অল্প সময়ের মধ্যে তা করা সম্ভব হবে না। ব্যবসায়ীদের দাবির প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, এ ব্যাপারে আমাদের কিছু করার নেই। অপেক্ষা করে দেখতে পারি নির্বাচিত সরকার কী করে। তবে কারিগরি কমিটি হয়ে বিষয়টি যাবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে। পেছানোর পক্ষে ৫১ শতাংশ ভোট পাওয়া সহজ কাজ নয়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অনুমোদন মিললে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাবে বাংলাদেশ। এর আগে ২০১৮ সালে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক-এই তিন সূচকেই উত্তীর্ণ হয়ে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে দেশ। ২০২১ সালের পর্যালোচনার পর জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ করে।

বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, আমরা চাই, এ উত্তরণ অন্তত তিন বছর পেছাক। কারণ, আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতি আছে। তিনি বলেন, কারিগরি শিক্ষা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ঘাটতি আছে ব্যবসায়ীদের। তবে সরকারের ঘাটতিই বড়। যে ক্লাবে আমরা উঠতে চাইছি, সেখানে অন্যদের ব্যাংকঋণের সুদ ৫ শতাংশের নিচে, আমাদের প্রায় ১৫ শতাংশ। অন্যদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিশ্চয়তা আছে, আমাদের আছে অনিশ্চয়তা। সুশাসন ও অবকাঠামোর ঘাটতিও রয়েছে। এত সমস্যা রেখে শুধু নামে এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে আমাদের লাভ কী?

উল্লেখ্য, একই সময়ে উত্তরণের মুখোমুখি লাওস ও নেপাল এখনো এলডিসি থেকে উত্তরণ পেছানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর