মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নতুন করে সংকটের মুখে পড়েছে। এই পথ দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন দেশি ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) এবং জিরো কার্বন অ্যানালাইটিকস আয়োজিত এক যৌথ অনলাইন আলোচনায় এসব তথ্য উঠে আসে।
আলোচনায় বক্তারা জানান, পারস্য উপসাগরে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। এই পথ দিয়েই বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি করা হয়। বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির প্রধান উৎস কাতার ও ওমান এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে হরমুজ প্রণালীতে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা সরাসরি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আইইইএফএ-এর এশিয়া অঞ্চলের এলএনজি গবেষণা প্রধান স্যাম রেনল্ডস বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতেই এশীয় অর্থনীতিগুলো আবারও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মুখে পড়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, এই সংকট বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতের ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। তিনি জানান, সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশে জ্বালানি আমদানির ব্যয় এবং সরকারি ভর্তুকির চাপ বহুগুণ বাড়বে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনি জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম বলেন, হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন ঘটলে দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে। যদি সংকট দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তবে প্রতিদিন প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে দেশের শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে চরম গ্যাস সংকট দেখা দেবে, যা সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে স্থবির করে দিতে পারে।
আইইইএফএ-এর বাংলাদেশ বিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম বর্তমান বাজারের চিত্র তুলে ধরে বলেন, গত ২ মার্চ স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ১৫ ডলার ছাড়িয়েছে এবং ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮২ ডলারে পৌঁছেছে। যেহেতু বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তির মূল্য তেলের দামের সঙ্গে যুক্ত, তাই তেল ও গ্যাস উভয় খাতেই আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারকে ভবিষ্যতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ রেশনিং বা লোডশেডিংয়ের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকট জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জান রোজেনো এবং এশিয়া সোসাইটির লি শুও বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা এখন কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের মতে, বাংলাদেশের সৌরশক্তির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা দ্রুত স্থাপন করে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বৃদ্ধিই দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল ও সশ্রয়ী জ্বালানি ব্যবস্থা উপহার দিতে পারে।
