পার্কভিউ বারে পুলিশের অভিযান নিয়ে প্রশ্ন, ডোপ টেস্ট না করেই সাজা!

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২৬, ০৭:৫৫ পিএম

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিবন্ধিত বারে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর অভিযান চলছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী এ অভিযানের নামে হয়রানি করছে। সবশেষ গত মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) রাত ১০টার দিকে রাজধানীর দারুস সালাম থানার টেকনিক্যাল মোরে পার্কভিউ নামে একটি রেস্টুরেন্ট ও বারে এডিসি এস এম ফজলে খোদার নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়।

এ সময় রেস্টুরেন্টে খেতে আসা ৩৫ জনকে আটক করা হয়। পরদিন বুধবার ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাদের বিভিন্ন মেয়াদে জেল ও জরিমানা করা হয়। অভিযানে রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার ও কর্মীদের মারপিট করা হয়।

পার্কভিউ কর্তৃপক্ষের দাবি, রেস্টুরেন্টে খেতে আসা অতিথিদের যেভাবে আটক করে জেল-জরিমানা করা হয়েছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। যেসব অতিথিকে আটক করে জেল-জরিমানা করা হয়েছে তারা রেস্টুরেন্টে খেতে আসছিলেন। তারা কোনও ধরনের মদ্যপান করেননি। সুতরাং তাদের কাছে মদ্যপানের পারমিট থাকার কোনও ধরনের বাধ্যবাধকতা নেই। মঙ্গলবার রাতে অতিথিদের আটক করে তাদের ডোপ টেস্ট করা হয়নি। কেউ অ্যালকোহল সেবন করলে তা ডোপ টেস্টে নিশ্চিত হওয়া যেত। কিন্তু তা না করে সরাসরি অ্যালকোহল সেবনের অভিযোগে তাদের আটকের পরদিন ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বিভিন্ন মেয়াদে জেল-জরিমানা করা হয়েছে। এটি পুরোপুরি বেআইনি।

তারা আরও বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী অধিদপ্তরের অনুমতি ও তাদের প্রতিনিধির উপস্থিতি ছাড়া বৈধ বারে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী অভিযান পরিচালনার কোনও এখতিয়ার নেই। পুলিশের এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে পরিত্রাণ পেতে উচ্চ আদালতে যাব।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক (ঢাকা উত্তরা জোন) শামীম আহমেদ বলেন, পার্কভিউ বার ও রেস্টুরেন্টে পুলিশের অভিযানের বিষয়ে তাদের কাছে কোনও তথ্য নেই।

এ বিষয়ে জানতে এডিসি এস এম ফজলে খোদাকে বারবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

বার অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কিছু সদস্য ও সোর্স কয়েকটি বারে বিনামূল্যে অ্যালকোহল সেবন, পারসেল নেওয়ার পাশাপাশি মাসোহারা দাবি করে আসছেন। মাসোহারা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর কয়েকটি বারে অভিযান চালানোর হুমকি দেয়। তারই জের ধরে গত কয়েক মাস ধরে রাজধানীর বারগুলোতে কখনও র‌্যাব, কখনও ডিবি আবার কখনও পুলিশ এখতিয়ার বহির্ভূত অভিযান চালিয়ে আসছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে ব্যবসা করার পরও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের চাহিদা অনুযায়ী চাঁদা না দিলেই চালানো হয় অনৈতিক অভিযান। অথচ বার ও রেস্টুরেন্ট ও আশপাশের এলাকা মোহাম্মদপুর ও মিরপুর এলাকায় অবৈধ মাদকের স্পট রয়েছে। এসব স্পটে অভিযান না করে বৈধ বারে শুধু চাঁদার দাবিতে এ ধরনের অভিযানের নাটক চালানো হয়।

বৈধ মদের বারগুলোতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে অভিযান পরিচালনার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে বার অ্যাসোসিয়েশনস। তাদের অভিযোগ, মাদক আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী মাঝে মাঝে অভিযানের নামে হয়রানি করছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া মদের বারে এ ধরনের অভিযান চালানোর এখতিয়ার কোনও সংস্থার নেই। তারপরও যদি কোনও অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালাতে হয়, সেক্ষেত্রে মাদক বিভাগের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এর আগেও র‍্যাবসহ অন্যান্য সংস্থা কয়েকটি বারে অভিযান চালিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি করে। সাবেক ডিবি প্রধান হারুণের নেতৃত্বেও কয়েকটি বারে অভিযান চালিয়ে একই কায়দায় বিতর্ক সৃষ্টি করে। এ নিয়ে তখন তোলপাড় চলায়, শেষ পর্যন্ত মালামাল ফেরত দিতে বাধ্য হন হারুণ। এ নিয়েও চলছে আইনি লড়াই।

গত অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে কখনও র‌্যাব, কখনও ডিবি আবার কখনও পুলিশ একই কায়দায় অভিযান পরিচালনা করছে। এ ধরনের অভিযান থেকে পরিত্রাণ পেতে ফের আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে বার অ্যাসোসিয়েশন।

জানা গেছে, রাজধানীর ‘র’ ক্যানভাসে ডিবির অভিযানের ঘটনায় ইতোমধ্যে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে চিঠি দিয়ে সেই রাতের অভিযানে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮-এর ২০ থেকে ২৩ ধারা পর্যন্ত বারে অভিযানের বিষয়ে বলা রয়েছে। আইনের ২০ ধারায় বারে প্রবেশ ও ইত্যাদি ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মহাপরিচালককে। এই ধারায় বলা হয়েছে, অনুমোদিত বারে মহাপরিচালক বা তার নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রবেশ, জব্দ ও তল্লাশি করতে পারবে। তবে অন্য কোনো বাহিনীর কথা বলা নেই।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বারের অনুমোদন বা লাইসেন্স মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর দেয়, তারাই এর দেখভাল করেন। বারে কোনো সংস্থা বা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করতে হলে অবশ্যই মহাপরিচালকের অনুমোদন নিতে হবে এবং তার প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাখতে হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ এর ২০ ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স বলে মাদকদ্রব্য বিক্রয়ের স্থানে প্রবেশ ও পরিদর্শন করার ক্ষমতা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অথবা তার নিকট হতে সাধারণ বা বিশেষভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত অফিসারকে দেওয়া হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এই ক্ষমতা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক পর্যন্ত অর্পণ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মেজর (অব.) জাহাঙ্গীর বলেন, পুলিশ, ডিবি, র‍্যাব কিংবা ভিন্ন যেকোনও সংস্থা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ছাড়া কোনও বৈধ কিংবা লাইসেন্সকৃত বারে এ ধরনের অভিযানে যেতে পারে না। এ ছাড়া এ সংক্রান্ত বিষয়ে হাইকোর্টেও একটি রিট রয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে পার্কভিউ রেস্টুরেন্ট ও বারে পুলিশের অভিযান নিয়ে যতদূর জেনেছি, তাতে পুলিশ এ অভিযানে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। তাদের অভিযানের পদ্ধতি সঠিক হয়নি। ডোপ টেস্ট  ছাড়া তারা যেভাবে রেস্টুরেন্টে আগত অতিথিদের আটক করে পরদিন ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে জেল-জরিমানা দিয়েছেন তা আইনসিদ্ধ নয়। এর বিরুদ্ধে আমরা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করব।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর