প্রেসিডেন্ট জিয়ার ৫শ টাকা বদলে দেয় হাতেম মোল্লার জীবন

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৩৬ এএম

‘আমি মনে করি জিয়াউর রহমান পিতৃতুল্য। যে উপকার করেছেন, আমার সারা জীবনডা এখন শান্তিতি যাচ্ছে, আমার আর কোনো কষ্ট নেই।’ ‘জিয়ার খাল’ নামে পরিচিত যশোরের শার্শা উপজেলার উলাসী খালপারে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে কথাগুলো বললেন ৭৫ বছর বয়সী, এখনো শক্তপোক্ত বৃদ্ধ হাতেম মোল্লা। তাঁর বাড়ি উলাসী গ্রাম লাগোয়া যদুনাথপুরবাক গ্রামে।

১৯৭৬ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দেওয়া ৫০০ টাকায় অভাব দূর করে নিজের জীবন বদলেছেন তিনি। অন্যের বাড়ির কামলা থেকে এখন ৫১ শতক ফসলের জমি ও ১৯ শতক বসতবাড়ির মালিক হয়েছেন। বড় করেছেন তিন ছেলে এক মেয়েকে। রয়েছে গবাদি পশু।

সব মিলিয়ে এখন সুখেই কাটছে একদা পরের বাড়িতে শ্রম বিক্রি করা মানুষটার।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিগগিরই যশোর আসবেন বলে শোনা যাচ্ছে। তিনি যশোরে এলে মেডিক্যাল কলেজের পাশাপাশি তাঁর পিতার স্মৃতিবিজড়িত উলাসী খাল পরিদর্শনে যাবেন—এমন কথাও চাউর হয়েছে। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও যাচ্ছেন উলাসী খাল এলাকায়।

এমন খবরে উলাসী গিয়ে দেখা হয় হাতেম মোল্লার সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে কথার এক পর্যায়ে উঠে আসে এসব তথ্য।
বাংলাদেশে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের প্রথম পদক্ষেপ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খাল কাটা কর্মসূচি। সেই কার্যক্রমের সূচনা হিসেবে পরিচিত যশোরের শার্শা উপজেলার ‘উলাসী-যদুনাথপুর’ খাল। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে এই খাল খনন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাজার হাজার মানুষের স্বেচ্ছাশ্রম ও সেনা সদস্যদের সহযোগিতায় প্রায় চার কিলোমিটার দৈর্ঘ্য খালটি খনন করতে সময় লেগেছিল প্রায় এক বছর। খাল খননের আগে এ অঞ্চলে জলাবদ্ধতার কারণে হাজার হাজার বিঘা জমি অনাবাদি থাকত।

জিয়াউর রহমান কেন আপনার পিতৃতুল্য? এমন কৌতূহল প্রকাশ করতে, খাল কাটা কার্যক্রম উদ্বোধনের দিনের সেই সুখের স্মৃতির ডালা খুললেন হাতেম মোল্লা। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান খাল কাটতে আসবেন শুনে এ অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছে উলাসীতে। উলাসী গ্রাম লাগোয়া গ্রাম যদুনাথপুরবাক। এ গ্রামেই বাড়ি তাঁর। তিনি তখন যুবক। তিনিও হাজির, জিয়াউর রহমানকে একনজর দেখতে চান। সেখানে সেনা সদস্যরা নিয়োজিত রয়েছেন শৃঙ্খলা রক্ষায়। তিনি পণ করলেন, যেভাবেই হোক কাছ থেকে দেখতে হবে জিয়াউর রহমানকে। খাল কাটা কার্যক্রম উদ্বোধন করতে জিয়াউর রহমান নির্ধারিত স্থানে এগোনোর সময় এক সেনা সদস্যের দুই পায়ের ফাঁকা অংশ দিয়ে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করলেন। তখন সেই সেনা সদস্য তাঁকে জাপটে ধরে রাখলেন।

হাতেম মোল্লা বললেন, “জিয়াউর রহমান সেই স্থান দিয়ে যাওয়ার সময় এমন দৃশ্য দেখে কী হয়েছে জানতে চাইলে সেনা সদস্য বলেন, ‘আপনাকে কাছ থেকে দেখতে ছেলেটি পাগল হয়ে গেছে।’ এরপর জিয়াউর রহমান কাছে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আমাকে ৫০০ টাকা দিয়ে বললেন, ‘ছাগল-গরু পালন করবা, ভালো থাকতে পারবা।’ এরপর তিনি মাটি কাটার জায়গায় গিয়ে নিজে হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কাটলেন, একটা ঝুড়িতে সেই মাটি রাখলেন, উনার সাথে থাকা ডিসি মহিউদ্দীন আলমগীর সেই মাটির ঝুড়ি তুলে নিলেন। এরপর হাজার হাজার মানুষ ঝাঁপায় পড়ল মাটি কাটতি। আমিও এই খালের মাটি কাটিছি।”

হাতেম মোল্লা বললেন, ‘আমি অন্যের বাড়িতে ১০ টাকা মাস মাইনে কাজ করতাম। সেই বাড়িতেই থাকতাম। তখন আমার খুব অভাব ছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমানের দেওয়া সেই ৫০০ টাকা দিয়ে আমি একটি গরু কিনি। সেই গরুর বাছুর হয়। বাছুর বড় হয়, বড় হওয়া সেই গরু ও দুধ বেচে জমানো ১২০০ টাকা দিয়ে ১৯ শতক বাড়ির জমি কিনি। তবে বন্ধ করিনি গরু পালন। সেই থেকে শুরু। এখনো আমি গরু পালি। এখন আমার মাঠে ৬১ শতক জমি আছে। জিয়াউর রহমানের দেওয়া সেই ৫০০ টাকায় গরু-বাছুর পালন করে করে এখন অনেক ভালো আছি। তিন ছেলে এক মেয়ে বড় করিছি। এখন আমি অনেক শান্তিতি আছি। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি জিয়াউর রহমানের জন্যি।’

উলাসী খালের পশ্চিমপারে বাড়ি আহম্মদ আলী ভুঁইয়ার। খাল খননের জন্য তাঁর বাবা ১৪ বিঘা জমি দিয়েছিলেন। এখন তাঁদের আবাদি জমি নেই। তবে তা নিয়ে দুঃখ নেই আহম্মদ আলীর। খালের যেখানে তাঁদের জমি ছিল, সেখানে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘আমাদের অঞ্চলের অনেক গ্রামের জমি জলাবদ্ধতার কারণে কৃষক আবাদ করতে পারত না। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এই খাল খনন করার পর দ্রুত বিলের পানি নামার ব্যবস্থা হয়। এই খাল খননের আগে এখানে মাঠ ছিল। এই মাঠে আমাদের ১৪ বিঘা জমিও এই খালের জন্য আমার আব্বা ইব্রাহিম ভুঁইয়া দিয়েছেন। তবে এই জমির জন্য দুঃখ নেই। কারণ এই খাল হওয়ার পর কৃষক এখন কোটি কোটি মণ ফসল পায়। আমাদের ভালো লাগে। এতেই আমাদের শান্তি। জমি-জায়গা এখন নেই। তার পরও আমরা অসন্তুষ্ট না। আমরা জিয়াউর রহমানের ওপর সন্তুষ্ট। কারণ কৃষক বেঁচে যাচ্ছে। এখন তাঁর ছেলে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তাঁর কাছে আমাদের অনুরোধ, তাঁর বাপের স্মৃতিটা যেন তিনি এসে দেখেন। খালটা আবার সংস্কার করেন। তাহলে তাঁর বাপের মতো তাঁর কাছেও কৃতজ্ঞ থাকব।’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারেক রহমান আসার সংবাদে উলাসী খাল এলাকাসহ এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে নতুন উৎসাহ, আশা ও উদ্দীপনার। তারা আনন্দিত এমন সংবাদে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী জামালউদ্দিন পিপুল। উলাসী গ্রামে তাঁর বাড়ি। তিনি বললেন, ‘এই উলাসী খালটা ‘জিয়ার খাল’ বলে পরিচিত। আমরা বিভিন্ন মহল থেকে শুনছি যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খুব শিগগির এখানে আসবেন। সরকারি কর্মকর্তারাও আসছেন। যে কারণে এলাকার মানুষ খুবই আনন্দিত। তাঁর পিতা একবার এখানে এসে গেছেন। তাঁর ছেলে এখন প্রধানমন্ত্রী। স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর অপেক্ষায় আছে সবাই। তবে অনেক দিন হওয়ায় খালটা কিছুটা ভরাট হয়ে গেছে। সে বিষয়ে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে আশা করি।’

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন