জাহাজমারী খালে ফিরেছে প্রাণ, কৃষকের মুখে হাসি, জাগল নতুন আশা

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ২ জুলাই ২০২৬, ১২:২৬ এএম

এক সময় খরার মৌসুমে এই খালে এক ফোঁটা পানিও থাকত না। গভীর নলকূপের পানি কিনে চাষ করতে হতো। আবার বর্ষা এলেই পানি নামার পথ না থাকায় শত শত বিঘা জমির ফসল তলিয়ে যেত। ঋণ করে চাষাবাদ করেও লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনতে হতো। এখন খালটি পুনঃখননের পর আবার জমিতে প্রাণ ফিরেছে। উপজেলা প্রশাসন যেসব উদ্যোগের আশ্বাস দিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে আমাদের কৃষি আরও সমৃদ্ধ হবে। – কথাগুলো বলছিলেন জাহাজমারী এলাকার কৃষক শেখ আব্দুর রব।

শেখ আব্দুর রবের এই কথাতেই ফুটে ওঠে জাহাজমারী খালকে ঘিরে কয়েক দশকের কৃষক জীবনের সংগ্রাম, বঞ্চনা এবং নতুন সম্ভাবনার গল্প। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে খনন করা জাহাজমারী খাল একসময় এ অঞ্চলের কৃষির প্রধান ভরসা ছিল। এই খালের পানিতে সেচ হতো, আবার বর্ষার অতিরিক্ত পানিও দ্রুত নিষ্কাশন হতো। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালটি পলি জমে নাব্যতা হারায়। ফলে খরার মৌসুমে দেখা দেয় তীব্র সেচ সংকট, আর বর্ষায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, ফসলের ফলন কমে আসে এবং হাজারো কৃষক পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে।

এই দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে রাজকীয় নেদারল্যান্ড দূতাবাসের আর্থিক সহযোগিতায় সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া এবং এর সহযোগী সংস্থা উত্তরণের বাস্তবায়নে ‘সফল ফর আইডব্লিউআরএম (IWRM)’ প্রকল্পের আওতায় ২০২৪ সালে দলুইপুর থেকে গোছমারা লস্কার বড় খাল পর্যন্ত ২ দশমিক ৯৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২৩ ফুট প্রশস্ত জাহাজমারী খাল পুনঃখনন করা হয়। এর ফলে প্রায় ৬২৫ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ ও পানি নিষ্কাশনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। খালের সুবিধাভোগী প্রায় তিন হাজার কৃষক এখন নতুন করে কৃষি উৎপাদনের স্বপ্ন দেখছেন।

পুনঃখননকৃত খালের নাব্যতা ধরে রাখতে সোমবার দুপুর ১২টার দিকে যুগিখালী ইউনিয়নের আড়খালী মসজিদ-সংলগ্ন জাহাজমারী খালে নিজ হাতে কচুরিপানা অপসারণের মাধ্যমে কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে খাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম। পরে জাহাজমারী মাইক্রো ওয়াটারশেড কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন যুগিখালী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মফিজুল ইসলাম। সঞ্চালনা করেন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আলম কাজল। উপস্থিত ছিলেন জাহাজমারী মাইক্রো ওয়াটারশেড খাল খনন কমিটির উপদেষ্টা আব্দুল গফুর, ইউপি সদস্য মনোয়ারা বেগম ও বিল্লাল হোসেন, খাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আব্দুল কাদের, ক্যাশিয়ার মো. মফিজুল ইসলাম, উফাপুর খাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আব্দুস সাত্তার, সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়ার কলারোয়া প্রোগ্রাম অফিসার গোলাম মশিউর রহমান, উত্তরণের ওয়াটার ক্লাস্টার ফ্যাসিলিটেটর মো. মাজহারুল ইসলাম, খোকন সরদার, দীপংকর কুমার মণ্ডল ও মো. কামরুজ্জামানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি এবং কৃষকরা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, একটি খাল পুনঃখনন করাই শেষ কথা নয়, এর নাব্যতা ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষকরা নিজেরাই যখন স্বেচ্ছাশ্রমে খাল পরিষ্কার করছেন, তখন এটি একটি অনুকরণীয় উদ্যোগ। উপজেলা প্রশাসন সবসময় আপনাদের পাশে থাকবে।

তিনি আরও বলেন, কৃষকদের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। খালের অবশিষ্ট ৭৪০ ফুট অংশ পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হবে। খালের পূর্ব পাশের সড়ক উন্নয়ন, কৃষিপণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে একটি নতুন কালভার্ট নির্মাণ, প্রতিবছর খাল সংস্কারের জন্য বরাদ্দ এবং খাল ব্যবস্থাপনা কমিটিকে প্রয়োজনীয় গাছের চারা সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে। এ জন্য আগামীকালের মধ্যেই প্রয়োজনীয় শ্রমিকের সংখ্যা ও গাছের চারার চাহিদা উল্লেখ করে আবেদন জমা দিতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে মফিজুল ইসলাম বলেন, এই খাল শুধু একটি জলাধার নয়, এটি হাজারো কৃষক পরিবারের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। খালটি সচল থাকলে কৃষি উৎপাদন বাড়বে, মানুষের আয় বাড়বে এবং এলাকার অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।

খাল খনন কমিটির উপদেষ্টা আব্দুল গফুর বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কৃষকরা এই খালের জন্য দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। পুনঃখননের মাধ্যমে সেই কষ্ট অনেকটাই দূর হয়েছে। এখন সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে খালটি রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।

ইউপি সদস্য মনোয়ারা বেগম বলেন, খাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার এই উদ্যোগকে আরও বেগবান করতে আমি ব্যক্তিগতভাবে ১০ হাজার টাকা অনুদান দিচ্ছি। কৃষকদের উন্নয়নে ভবিষ্যতেও পাশে থাকব।

ইউপি সদস্য বিল্লাল হোসেন বলেন, খালটি পুনরুজ্জীবিত হওয়ায় এলাকার কৃষি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এই অর্জন ধরে রাখতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।

সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়ার কলারোয়া প্রোগ্রাম অফিসার গোলাম মশিউর রহমান বলেন, এই প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু খাল পুনঃখনন নয়; টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষিকে লাভজনক ও স্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো। আজ কৃষকরা নিজেরাই খাল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিচ্ছেন, এটিই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

খাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আব্দুল কাদের বলেন, আগে সেচের পানির অভাবে অনেক জমি অনাবাদি থাকত। বর্ষায় আবার জলাবদ্ধতায় ফসল নষ্ট হতো। এখন পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। প্রকল্প শেষ হলেও আমরা নিজেদের অর্থায়নে একটি তহবিল গঠন করেছি। সেই তহবিল থেকেই প্রতি বছর খাল পরিষ্কার করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কখনও এই খাল ভরাট হয়ে কৃষকের দুর্ভোগের কারণ না হয়।

অনুষ্ঠানে কৃষকরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে খালের অবশিষ্ট ৭৪০ ফুট অংশ পুনঃখনন, খালের পূর্ব পাশের সড়ক উন্নয়ন, কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য একটি উপযোগী কালভার্ট নির্মাণ, নিয়মিত সংস্কারের জন্য সরকারি বরাদ্দ এবং খালের দুই পাড়ে বৃক্ষরোপণের দাবি জানান। কৃষকদের দাবির প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিয়ে ইউএনও আরিফুল ইসলাম দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তাঁর এই প্রতিশ্রুতিতে কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।

অনুষ্ঠান শেষে ছয়টি গ্রামের প্রায় ৩০ জন কৃষক কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে অংশ নেন। কৃষকদের ভাষ্য, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও তারা নিজেদের গঠিত তহবিলের মাধ্যমে প্রতিবছর খাল পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। তাদের বিশ্বাস, প্রশাসনের সহযোগিতা, উন্নয়ন সংস্থার পরিকল্পনা এবং স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জাহাজমারী খাল আর কখনও অবহেলায় হারিয়ে যাবে না। বরং এই খালকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠবে একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থা, বৃদ্ধি পাবে ফসলের উৎপাদন, কমবে চাষাবাদের ব্যয় এবং সমৃদ্ধ হবে এ অঞ্চলের হাজারো কৃষক পরিবারের জীবন-জীবিকা।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর