সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নয়, বরং সমাজভিত্তিক প্রতিরোধ, পুনর্বাসন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের অবস্থান আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেছে মালয়েশিয়া। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত চতুর্থ জাতিসংঘ উচ্চপর্যায়ের সন্ত্রাসবাদবিরোধী সম্মেলনে দেশটির অংশগ্রহণকে নিরাপত্তা কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।সম্মেলনে মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (কেডিএন) নিরাপত্তাবিষয়ক উপ-মহাসচিব দাতো হাজি আবদুল হালিম বিন হাজি আবদুল রহমান। তিনি “দ্য গ্লোবাল টেররিজম থ্রেট ল্যান্ডস্কেইপ” অধিবেশনে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদী হুমকির পরিবর্তিত বাস্তবতা নিয়ে মালয়েশিয়ার অবস্থান তুলে ধরেন। পরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নবম গ্লোবাল কাউন্টার-টেররিজম স্ট্র্যাটেজি নিয়ে মালয়েশিয়ার জাতীয় বক্তব্যও উপস্থাপন করেন।
গত এক দশকে মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতার অন্যতম সক্রিয় রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ইসলামিক স্টেট (আইএস)-ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্ক, অনলাইন উগ্রবাদ, সীমান্ত অতিক্রমকারী জঙ্গি যোগাযোগ এবং একক হামলাকারীর (লোন উলফ) ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশটি আইন প্রয়োগের পাশাপাশি গোয়েন্দা সহযোগিতা ও সামাজিক প্রতিরোধব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মালয়েশিয়ার বর্তমান কৌশলের বড় বৈশিষ্ট্য হলো শুধু গ্রেপ্তার বা বিচার নয়; উগ্রবাদে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আগেই চিহ্নিত করা, স্থানীয় সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করা এবং পুনর্বাসনের মাধ্যমে চরমপন্থায় পুনরায় জড়িয়ে পড়া ঠেকানো।
সম্মেলনের সাইড ইভেন্ট সিক্সটিন-এ মালয়েশিয়া তাদের “লোকালাইজড অ্যান্ড হোল-অব-সোসাইটি অ্যাপ্রোচেস ইন প্রিভেন্টিং অ্যান্ড কাউন্টারিং ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিজম” মডেল উপস্থাপন করে। সেখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বিভাগের সচিব দাতুক জুলকিফলি বিন আবিদিন এবং প্রধান সহকারী সচিব এলিনা বিনতি রোসলিম জানান, উগ্রবাদ প্রতিরোধে স্থানীয় কমিউনিটি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব, পরিবার এবং সরকারি সংস্থার সমন্বিত অংশগ্রহণই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
তাদের উপস্থাপনায় যুবসমাজকে উগ্রবাদী প্রচারণা থেকে দূরে রাখা, কমিউনিটি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পুনর্বাসন কর্মসূচির অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা হয়।
২০২৪ সালে জোহরের উলু তিরামে পুলিশ স্টেশনে হামলার পর মালয়েশিয়া অনলাইন উগ্রবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরমপন্থী প্রচারণা এবং একক হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় নজরদারি আরও জোরদার করে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক তথ্য বিনিময়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই সাউথইস্ট এশিয়া রিজিওনাল সেন্টার ফর কাউন্টার-টেররিজম (এসইএআরসিসিটি)-এর মাধ্যমে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং সক্ষমতা উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়ার এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উভয় দেশই সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন, অনলাইন উগ্রবাদ এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। জাতিসংঘের মতো বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে মালয়েশিয়ার সক্রিয় ভূমিকা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন সুযোগও সৃষ্টি করতে পারে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সমাজভিত্তিক প্রতিরোধ, শিক্ষা, পুনর্বাসন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এই চার স্তম্ভকে কেন্দ্র করেই মালয়েশিয়া এখন তার নিরাপত্তা কূটনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। জাতিসংঘের এবারের সম্মেলনে দেশটির সক্রিয় অংশগ্রহণ সেই কৌশলেরই আন্তর্জাতিক প্রতিফলন।
