ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের আটতলায় আগুন লাগার ঘটনায় আতঙ্কে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে কুলসুমা নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় তার বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনের আটতলায় আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়লে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। এ সময় অনেকে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন। তাড়াহুড়ো ও হুড়োহুড়ির মধ্যে কয়েকজন পড়ে গিয়ে আহত হন।
নিহত কুলসুমার মিম মেয়ে বলেন, ‘আগুন লাগার খবর পেয়ে আমার মা ও ছোট ভাই একসঙ্গে নিচে নামার চেষ্টা করছিলেন। সিঁড়িতে প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে তারা পড়ে যাই। পরে আমি উঠে আমার ভাইকে টেনে তুলি। এরপর মাকে উদ্ধারের চেষ্টা করলে ভিড়ের মধ্যে তাকে কয়েক দফা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়।’
মিম বলেন, ‘আমার মা তখন আমাকে একবার ডাক দিয়ে বলছিল ‘ও মিমি, আমারে ধরলি না?’ আমি মানুষের চিপার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। পরে উঠে আমার ছোট ভাইকে তুলেছি। এরপর মাকে আনতে গেলে আমাকে দুইবার ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। পরে অনেক কষ্টে মাকে সিঁড়ির কাছ থেকে উদ্ধার করে নিচে নামানো হয়। সেখানে পানি দেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।’
মিমের অভিযোগ, জরুরি বিভাগে নেওয়ার পরও তার মায়ের যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ‘আমি অনেকজনকে বলেছি, একটু পানি দেন, একটু ধরেন। পরে দুজন এসে তাকে ধরে নিচে নামায়। ইমার্জেন্সিতে নেওয়ার পর অক্সিজেন দেওয়া হয়। আমি বারবার বলেছি, আমার আম্মু অসুস্থ, একটু দেখেন। তারা বলছিল—দাঁড়াও, দাঁড়াও।’
মিমের অভিযোগ, তার মাকে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার পরিবর্তে টাকা ও ফরম পূরণের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তার ভাষায়, ‘আগে টাকা না আগে রোগী? আমার রোগীকে তো আগে বাঁচাবে। পরে টাকা নেওয়ার দরকার হলে টাকা নিত। কিন্তু আগে বলছে, টাকা দেন, টাকা দেন। আমি তখন টাকা খুঁজছিলাম। পরে টাকা দেওয়ার পর ফরম ফিলাপ করানো হয়েছে। যদি আমার আম্মুকে সঙ্গে সঙ্গে ভালোভাবে পরীক্ষা করত, তাহলে হয়তো আজকে তাকে ফিরে পেতাম।’
এদিকে হাসপাতাল সূত্র ও স্বজনদের কাছ থেকে জানা যায়, অগ্নিকাণ্ডের সময় হুড়োহুড়িতে কয়েকজন সিঁড়িতে পড়ে যান। অভিযোগ উঠেছে, ভবনের তিনটি সিঁড়ির মধ্যে মাত্র একটি সিঁড়ি খোলা ছিল। এ কারণে আতঙ্কিত রোগী ও স্বজনদের দ্রুত নিচে নামতে গিয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট প্রায় দেড় ঘণ্টা চেষ্টা করে। পরে ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
ঘটনার পর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন সাংবাদিকদের জানান, অগ্নিকাণ্ডের সময় পদদলিত হয়ে ছয়জনের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে।
হাসপাতালের রেজিস্ট্রারের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে কুলসুমা নামে এক নারীর তথ্য পাওয়া যায়। পরে তার পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অগ্নিকাণ্ডের সময় হুড়োহুড়ি করে নিচে নামতে গিয়ে তারাকান্দা উপজেলার ওই নারী নিহত হন।
একইভাবে ফুলবাড়িয়া উপজেলার শাহজাহান নামে আরেকজনের মৃত্যুর খবরও তার ছেলে নিশ্চিত করেছেন। ঘটনার সময় তারা হাসপাতাল ভবনের ভেতরে ছিলেন।
তবে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর বিভাগীয় কমিশনার জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য এখনই নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি তদন্তের পর প্রকৃত তথ্য জানা যাবে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার সময় ভবনের সিঁড়িগুলো কেন বন্ধ বা তালাবদ্ধ ছিল, কোনো অনিয়ম ছিল কি না এসব বিষয়ও তদন্ত করে দেখা হবে।
এদিকে আগুনের ঘটনায় পদদলিত হয়ে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা ও কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে হাসপাতালের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি মুহূর্তে সিঁড়ি ব্যবহারের সুযোগ এবং রোগীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পরিবারের দাবি, শুধু আগুন লাগার ঘটনা নয়, আতঙ্কের মুহূর্তে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ও পরবর্তী চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা ছিল কি না তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হোক।
এদিকে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে ৫ সতস্যের তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। আগামী তিন কার্যদিবসের তদন্ত কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, ‘গতকালের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে। তিনি নিজে সদস্যসচিবের দায়িত্বে আছেন। কমিটিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুজন এবং ফায়ার সার্ভিসের একজন প্রতিনিধি রয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘লিফটে আগুন লাগার ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তদন্ত কমিটি আগুন লাগার সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখবে। ঘটনায় কারও গাফিলতি ছিল কি না, থাকলে তা চিহ্নিত করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে। তদন্তে অন্য কোনো বিষয় উঠে এলে সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে।’
