ঘরের দরজায় পা রাখতেই থমকে যেতে হয়। দেয়ালে চোখ যেতেই ভেসে উঠছে এক শিশুর হাসিমুখ। ৭ বছরের ছোট্ট মেয়ে অনুশ্রীই ছিল তার মা-বাবার পুরো পৃথিবী। প্রাণের চেয়েও প্রিয়। তবে যে দেয়ালগুলোতে এতদিন ছড়িয়ে ছিল রঙিন আনন্দ, আজ সেখানে ভর করেছে নিস্তব্ধ শোক। মরণব্যাধি ডেঙ্গু কেড়ে নিল একটি পরিবারের সমস্ত আলো, রেখে গেল কখনোই পূরণ না হওয়া শূন্যতা।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) নগরীর পাহাড়তলী এলাকার ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে অনুশ্রী দাশ (৭)। দন্ত চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে কর্মরত সুবল দাশের এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সাত বছরের মেয়ে অনুশ্রী ছিল ছোট। সে চট্টগ্রামের রেলওয়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী।
অনুশ্রীর বাবা সুবল দাশ জানান, গত ১৩ সেপ্টেম্বর তার মেয়ের জ্বর আসে। শুরুতে স্থানীয় চিকিৎসককে দেখালেও পরবর্তীতে শিশু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হলে পরীক্ষার মাধ্যমে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঘরেই শিশুটির চিকিৎসা চলছিল। পরবর্তীতে শিশুটির রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ কমতে থাকলে ১৮ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) সকালে নগরীর খুলশী এলাকার চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে থাকা অবস্থায় তারা আইসিইউর খোঁজে বিভিন্ন হাসপাতালে যোগাযোগ করেন। অবস্থার আরও অবনতি হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে ওইদিন সন্ধ্যায় নগরীর পাহাড়তলী এলাকার এপোলো ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক আইসিইউ বিভাগে অনুশ্রীকে ভর্তি করানো হয়। সেখানেই শনিবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যায় প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী অনুশ্রী।
অনুশ্রীর বাবা সুবল দাশ কালবেলাকে বলেন, ‘যেদিন আমার মেয়েকে ইম্পেরিয়ালে ভর্তি করায়, ওইদিন সে আমাকে কান্না করে বলছিল, বাবা, আমি থাকব না। এমনকি শনিবার যেদিন মারা যায়, ওইদিন দুপুরেও আমি দেখা করতে গেলে সে বাসায় চলে যাওয়ার বায়না করতে থাকে। ওইদিন বিকেলে চিকিৎসকরা আমাকে জানান, আমার মেয়ের অবস্থা ভালো না, লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজন হবে। বলতে বলতেই বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আমার মেয়েকে মৃত ঘোষণা করে।’
গত ২ আগস্ট বড় করে মেয়ের জন্মদিন পালন করেছেন জানিয়ে আবেগজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘সবাইকে নিয়ে আমার মেয়ের জন্মদিন আমি ধুমধাম করে পালন করেছি। সামর্থ্য না থাকার পরেও তার মুখের দিকে তাকিয়ে তার সব ইচ্ছা আমি পূরণ করেছি। আমার মেয়ে বাবা ছাড়া কিছু চিনেই না। এখন আমি কাকে নিয়ে বাঁচব?’
মেয়ের সুস্থতা কামনা করে ফেসবুকে তার বাবা সুবল লেখেন, ‘যাদের বাসায় পূজার আসন আছে, আর যারা আমার মুসলিম ভাইবোন আছেন, সবার কাছে হাতজোড় করে বলছি, আমার অনুশ্রীর জন্য আশীর্বাদ করবেন। মুসলিম ভাইয়েরা মসজিদে গিয়ে দোয়া করবেন।’
জ্বরে কাবু হয়ে অনুশ্রী তখন ঠিকমতো খেতেও পারছিল না। বাবার হাতে খেতে ভালোবাসত মেয়েটি। সেই স্মৃতিও লিখেছিলেন সুবল। ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘আমার আদরের মেয়ে হাসপাতালে ভর্তি। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। বাবার হাতে খেতে মেয়ে কত পছন্দ করত। আজকে দুদিন ওর মুখে কিছুই তুলে দিতে পারছি না। খাবারের প্রতি ওর এত অনীহা।’
শনিবার সকালে অনুশ্রী মারা যাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাত্র কয়েকটি শব্দ লিখেছেন সুবল চন্দ্র দাশ, ‘আমার মেয়ে অনুশ্রী আর নেই।’
শেষবিদায়ের ছবি দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমার মামণি অনুশ্রীকে কত সুন্দর করে সাজিয়ে দিলাম। বাবার কত আদরের মেয়ে ছিল। ঈশ্বরের চরণে শেষবিদায় দিয়ে আসলাম।’
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ‘শিশুটির ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছি। তার অবস্থা ডিআইসি পর্যায়ে চলে গিয়েছিল, যেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।’
রেলওয়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সালমা আক্তার জানান, ‘অনুশ্রী খুব লক্ষ্মী মেয়ে। তার বাবা নিয়মিত তাকে স্কুল থেকে আনতে যেতেন। খুবই বাবাপ্রিয় মেয়ে ছিল সে। আমাদের বিদ্যালয়েই সে তিন বছর ধরে পড়াশোনা করছিল।’
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, অনুশ্রীর বাবা-মায়ের সংসারটা ভেঙে গিয়েছিল ছয় বছর আগেই। আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন দুজন। তবে অবুঝ মেয়েটির দিকে তাকিয়ে নিজেদের জীবনটাকে নতুন করে বাঁধার কথা ভাবেননি দুজনের কেউই। দীর্ঘদিন বাবা-মায়ের মধ্যে সম্পর্ক না থাকলেও নিজেদের দুই ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তারা সম্প্রতি একই এলাকায় বসবাস শুরু করেন।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রামে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ বছরের শিশু সিরাজুম মনিরা নামে আরেক শিশু মারা যায়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। সিরাজুম মনিরা সীতাকুণ্ড পৌরসভার আমিরাবাদ এলাকার নুরুন্নবীর মেয়ে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, কয়েক দিন ধরে তীব্র জ্বরসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিল মনিরা। একপর্যায়ে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে মঙ্গলবার তাকে সীতাকুণ্ড পৌরসদরের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে এনএস-১ পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরে চিকিৎসক শিশুটিকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। হাসপাতালে নেওয়ার পর বুধবার তার অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার সকালে তার মৃত্যু হয়।
