কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা ছাত্রদলের এক নেতাকে অপহরণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় ফাঁস হওয়া একটি অডিও রেকর্ড তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ফাঁস হওয়া অডিওতে নিজেকে স্থানীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা দাবি করা মিজান নামের এক ব্যক্তিকে ওই ছাত্রদল নেতাকে ‘১৪ টুকরো’ করার হুমকি দিতে শোনা গেছে। এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য রহস্য উন্মোচনে বিষয়টি নতুন মোড় নিয়েছে।
নিহত ছাত্রদল নেতার নাম ইসফাতুল ইসলাম জিসান (২৮)। তিনি চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক এবং লোটনি গ্রামের নাজেম উদ্দিন নাজুর ছেলে। হত্যাকাণ্ডের পর সোমবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কল রেকর্ডটি ছড়িয়ে পড়ে। এর পর পরই অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয় দেওয়া মিজানের পরিবারের চার নারী সদস্যসহ পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে চকরিয়া সদর থেকে নিজ বাড়ি লোটনি গ্রামে ফিরছিলেন জিসান। পথে কাকারা সাবের সদর বাজারের (মাঝের স্টেশন) একটি দোকানের সামনে থেকে একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাসে এসে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। অপহণের চার ঘণ্টা পর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কচ্ছপিয়া ঢালা এলাকা থেকে তার হাত-পা বাঁধা রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিও রেকর্ডে জিসানের বড় ভাই কায়সার এবং নিজেকে আওয়ামী লীগ নেতা দাবি করা মিজানের মধ্যকার কথোপকথন উঠে আসে। সেখানে মিজানকে বলতে শোনা যায়, ‘জিসানকে ধরার জন্য ৫০ জন মানুষ লাগিয়ে রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত। তাকে আমি ১৪ টুকরো করতে পারি। আমার সবকিছু আছে- টাকা ও শক্তি সবকিছু আছে।’
স্বজনদের অভিযোগ, অপহণের পর জিসানকে চকরিয়া পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সবুজবাগ এলাকার ‘কবির টাওয়ারে’ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। পরে ঘাতকরা মরদেহ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কচ্ছপিয়া ঢালা এলাকায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।
এদিকে অডিও ফাঁসের পর সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চকরিয়া থানা পুলিশ আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয় দেওয়া মিজানের বাসভবন ও সম্ভাব্য আস্তানায় অভিযান চালায়। তবে তাকে না পেয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার পরিবারের চার নারী সদস্য ও বাড়ির কেয়ারটেকারকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
পুত্রশোকে বাকরুদ্ধ জিসানের বাবা নাজেম উদ্দিন নাজু কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘আমার নিষ্পাপ ছেলেটাকে ওরা ধরে নিয়ে গিয়ে এভাবে মেরে ফেলল! তারা আমার বুকের ধনকে নির্মম অত্যাচার করে হত্যা করেছে। সে তো কোনো অপরাধ করেনি। আমার ছেলের কী অপরাধ ছিল যে তাকে এভাবে নির্যাতন করে মরতে হলো? প্রশাসনের কাছে আমার বুকের মানিককে যারা কেড়ে নিয়েছে, সেই খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’
ঘটনার তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করে চকরিয়া উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি রেজাউল করিম বাপ্পি বলেন, ‘জিসান ছাত্রদলের একজন উদীয়মান ও সক্রিয় নেতা ছিলেন। তাকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার না করা হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে রাজপথে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।’
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) অহিদুর রহমান জানান, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মিজানের পরিবারের চার নারী সদস্য ও বাড়ির কেয়ারটেকারকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
