দক্ষ মানুষই হবে প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৩ এএম

সড়ক, সেতু, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পাঞ্চল একটি দেশের অর্থনীতির দৃশ্যমান শক্তি। কিন্তু উন্নত অর্থনীতিতে উত্তরণের শেষ সিঁড়িটি তৈরি হয় মানুষের মেধা, দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা ও উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিও এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সস্তা ও বিপুল শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরতার পুরোনো মডেল থেকে বেরিয়ে উৎপাদনশীল, দক্ষতা ও জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির দিকে যাওয়ার তাগিদ বাড়ছে। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যেও বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বিনিয়োগকে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘উৎপাদন ও বিনিয়োগকে অর্থনীতির সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ বিনিয়োগ যেন শুধু সম্পদ তৈরি না করে, উৎপাদন বাড়ায়; উৎপাদন যেন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং সেই কর্মসংস্থান যেন আয় ও রাজস্ব বাড়িয়ে অর্থনীতিকে আরও বিস্তৃত করে।’

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে হবে এবং বিনিয়োগকে উৎপাদনমুখী করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঋণনির্ভর ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থাননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায় সরকার। এজন্য শিল্পায়ন ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন দক্ষ শ্রমশক্তি, মানসম্মত কর্মসংস্থান ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘শ্রমজীবী মানুষ জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।’

তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার বক্তব্যে শুধু কর্মসংস্থানের সংখ্যা নয়, কর্মসংস্থানের মান এবং শ্রমিকের দক্ষতাকেও অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাকিফ শামীম তার বিশ্লেষণে শিক্ষা, দক্ষতা, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূল বিনিয়োগ হিসেবে দেখিয়েছেন।

তার বিশ্লেষণে বাংলাদেশের উন্নয়নের পরের ধাপের মূল প্রশ্নটি সামনে এনেছেন উন্নত অর্থনীতির পথে আসল বিনিয়োগ কোথায়? সাকিফ শামীমের মতে, ‘উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতিতে উত্তরণের ইতিহাসে দেখা যায়, কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে শুধু অবকাঠামো, মূলধন কিংবা সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে উন্নত হয়নি। একটি পর্যায়ে গিয়ে প্রবৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, প্রযুক্তি গ্রহণের সক্ষমতা ও উদ্ভাবন।’

তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দরিদ্র দেশটি প্রথমে শ্রমনির্ভর শিল্প ও রপ্তানির ওপর দাঁড়ালেও পরে শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষা এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ায়। সেই দক্ষ শ্রমশক্তিই পরে গাড়ি, ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প গড়ে তোলে।’

তাইওয়ানের অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। কৃষি ও শ্রমনির্ভর উৎপাদন থেকে শিক্ষা, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গবেষণায় বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশটি ইলেকট্রনিকস, নির্ভুল উৎপাদন ও সেমিকন্ডাক্টর ভিত্তিক শিল্পে উঠে এসেছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি তাই সরাসরি যে, শুধু কত মানুষকে শিক্ষিত করা হলো, তা নয়; সেই মানুষ কতটা দক্ষ হলো এবং অর্থনীতিতে তার দক্ষতা কতটা কাজে লাগানো হলো। দেশে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হচ্ছেন। অথচ শিল্প ও ব্যবসা খাতে নির্দিষ্ট দক্ষতার কর্মীর ঘাটতির কথা শোনা যায়। অর্থাৎ শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে এখনও বড় ফাঁক রয়েছে’

তিনি আরও বলেন, ‘এই ফাঁক দূর করতে বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতকে একই দক্ষতা-ব্যবস্থার অংশ করতে হবে। কারিকুলাম নির্ধারণে শিল্পের ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি কর্মজীবীদের নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুনঃদক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এই পরিবর্তনকে আরও দ্রুত করছে। হিসাব, সফটওয়্যার, ডিজাইন, কনটেন্ট, গ্রাহকসেবা, গবেষণা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআই কাজের ধরন পাল্টে দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের তরুণদের প্রচলিত দক্ষতা নয়, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা ও অভিযোজন ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।’

সাকিফ শামীম বলেন, ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতাও বদলাবে। কম শ্রমমূল্যের সুবিধার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, পণ্যের বৈচিত্র্য, মান ও দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে এখন থেকেই শিক্ষা, দক্ষতা, শিল্পনীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নীতিকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।

তার মতে, ‘সবচেয়ে বড় প্রকল্প হতে পারে মানুষের সক্ষমতা তৈরি।’

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর