রামু ট্র্যাজেডির ১৪ বছর, বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১০ এএম

কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে ভয়াবহ হামলার ১৪ বছর পূর্ণ হলেও এখনো শেষ হয়নি বিচারপ্রক্রিয়া। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে সংঘটিত ওই হামলায় রামুর ১২টি বৌদ্ধ বিহার ও ৩০টি বসতঘরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা। তারা দ্রুত বিচার শেষ করে প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

২০১২ সালের ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর রামুর পাশাপাশি উখিয়া ও টেকনাফেও বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলা চালানো হয়। উত্তম বড়ুয়া নামে এক বৌদ্ধ যুবকের বিরুদ্ধে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাতের অন্ধকারে রামুর ১২টি বৌদ্ধ বিহার, ৩০টি বসতঘর এবং উখিয়া-টেকনাফের সাতটি বৌদ্ধ বিহার ও ১১টি বসতঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এছাড়া আরও ছয়টি বৌদ্ধ বিহার ও শতাধিক বসতঘরে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বিহার ও বসতঘর পুনর্নির্মাণ করে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ১৪ বছরে এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরে এলেও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সংশয় ও ধোঁয়াশা কাটেনি বলে জানিয়েছেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা। প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে পুনঃতদন্তের দাবিও জানিয়েছেন অনেকে।

স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতারা বলছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধে রামুর বৌদ্ধ বিহারগুলোতে সরকারি নিরাপত্তা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

এদিকে হামলার ভয়াবহ দিনটি স্মরণে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে রামু বুড্ডিস্ট সোশ্যাল মুভমেন্ট বাংলাদেশ। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বুদ্ধ উপাসনা, পতাকা উত্তোলন, অষ্টশীল গ্রহণ, চিত্রাঙ্কন ও চিত্র প্রদর্শনী এবং চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলার ঘটনায় মোট ২০টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে বাদীর সম্মতিতে একটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে বাকি মামলাগুলোর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

রামু, উখিয়া ও টেকনাফে সহিংসতার ঘটনায় এজাহারভুক্ত ৩৭৮ জনসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ হাজার ১৮২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এসব মামলায় ৯৩৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ।

রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের অধ্যক্ষ শীলপ্রিয় মহাথের বলেন, ‘২০১২ সালের এদিনে সংঘটিত সহিংসতার ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও আমরা সঠিক বিচার পাইনি। তাই বর্তমান সরকারের কাছে অনুরোধ, রামুর বৌদ্ধ মন্দিরে হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সঠিক বিচার নিশ্চিত করা হোক। পাশাপাশি নিরীহ কাউকে যেন বিচারের নামে হয়রানি করা না হয়, সেটিও সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।’

স্থানীয় ছাত্রনেতা মোহাম্মদুল হক জনি বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকে এখানে সম্প্রীতির মধ্যে বড় হয়েছি। তবে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে সন্ত্রাসীদের হামলায় রামুর বৌদ্ধ মন্দিরগুলো আক্রান্ত হয়েছিল। দুঃখের বিষয়, সেদিনের তাণ্ডবে জড়িতদের এখনো বিচার হয়নি। হামলার ১৪ বছরে এসে নির্বাচিত সরকারের কাছে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি জানাচ্ছি।’

অ্যাডভোকেট শিপ্ত বড়ুয়া বলেন, ‘রামুর বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ বসতিতে হামলার ১৪ বছর অতিক্রান্ত হলেও আমাদের বিচার চাইতে হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য যেমন লজ্জার, তেমনি রাষ্ট্রের জন্যও লজ্জার। আমরা বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রপক্ষের কাছ থেকে শুনে এসেছি, সাক্ষীর অভাবে বিচারকাজ থমকে আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘হামলার সময়কার ছবি ও ভিডিওচিত্রগুলোকে সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করে বিচারকাজ এগিয়ে নেওয়া ছাড়া সঠিক ও ন্যূনতম বিচার পাওয়ার সুযোগ নেই আমাদের।’

কক্সবাজার বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, ‘রামু সহিংসতার ১৪ বছরে এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরে এসেছে। রামুর বৌদ্ধরা দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধ বিহার পেয়েছেন। কিন্তু ঘটনার ১৪ বছর পরও মামলার কার্যক্রম প্রাথমিক পর্যায়ে থমকে আছে। পুলিশ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিলেও একটি মামলাও নিষ্পত্তি হয়নি। বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে তাই নানা সংশয় দেখা দিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রামুতে ১৮টি মামলার বাদীই পুলিশ। পুলিশ কাকে আসামি করেছে, কাকে বাদ দিয়েছে, তা বৌদ্ধ সম্প্রদায় জানে না। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে পুলিশকে বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও যারা মিছিলের সামনের সারিতে ছিল এবং যারা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে নেতৃত্ব দিয়েছে, তাদের অনেকের নাম পুলিশের অভিযোগপত্রে নেই।’

প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু আরও বলেন, ‘রামু সহিংসতার মতো আর কোনো ঘটনা যাতে বাংলাদেশে না ঘটে, সে জন্য এ ঘটনার একটি দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া উচিত।’

মামলার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. ইউনুছ জানান, এ ঘটনায় দায়ের করা ১৮টি মামলার মধ্যে ১১টির সাক্ষ্যগ্রহণ চলমান রয়েছে। উখিয়ায় চারটি মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করা হয়েছে। অন্য তিনটি মামলার সর্বশেষ পরিস্থিতি জানা যায়নি।

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের হস্তক্ষেপে মামলাগুলোতে নিরপরাধ বিএনপি-জামায়াতের লোকজনকে আসামি করা হয়েছে। সে কারণে সাক্ষ্যগ্রহণ চললেও সাক্ষীরা নিয়মিত আদালতে আসেন না। এ কারণে সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। ফলে মামলার কার্যক্রমও এগোচ্ছে না।’

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর