ময়মনসিংহের ত্রিশালে দিন দিন বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহন চলাচল, যত্রতত্র যানবাহন থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা এবং অনিয়ন্ত্রিত পার্কিংসহ নানা কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে দুর্ঘটনার একটি বড় অংশে সিএনজিচালিত অটোরিকশা জড়িত থাকায় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ত্রিশাল থানা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে ত্রিশাল উপজেলায় ১৩টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৩ জন নিহত ও ১৬ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে সেপ্টেম্বর মাসের ৭টি দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ১৪ জন আহত হয়েছেন।
এ হিসাবে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের মাসে ত্রিশালে মোট ২০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত এবং ৩০ জন আহত হয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ত্রিশালে বাস, ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কোথাও পেছন থেকে ধাক্কা, কোথাও মুখোমুখি সংঘর্ষ আবার কোথাও দ্রুতগতির যানবাহনের কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে সড়কে বিদ্যমান ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বইলরের বাসিন্দা প্রত্যক্ষদর্শী রফিক মিয়া বলেন, দুর্ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলের কাছেই ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে সেখানে গিয়ে দুটি যানবাহনের সংঘর্ষ দেখতে পান। তার ধারণা, দ্রুতগতির কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
বালিপাড়ার বাসিন্দা বেলাল আহমেদ বলেন, এ সড়কে অনেক সময় বাস ও ট্রাক দ্রুতগতিতে চলাচল করে। একই সঙ্গে সিএনজি ও অন্যান্য ধীরগতির যানও চলাচল করে। ওভারটেক করার সময় চালকেরা অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকি নেন। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়।
চকরামপুরের বাসিন্দা রফিক বলেন, অনেক জায়গায় সিএনজি ও অন্যান্য যানবাহন রাস্তার ওপর দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। এতে পেছন থেকে আসা গাড়িগুলো হঠাৎ লেন পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমতে পারে।
বিরামপুরের বাসিন্দা মামুন বলেন, দুর্ঘটনার পর সাধারণ মানুষই প্রথমে আহতদের উদ্ধারে এগিয়ে আসে। অনেক সময় আহতদের হাসপাতালে নিতে দেরি হয়। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
বাগানের বাসিন্দা সোলাইমান বলেন, তারা নিয়মিত এই সড়ক দিয়ে চলাচল করেন। প্রায়ই বেপরোয়া গতির যানবাহন দেখা যায়। চালকদের গতি নিয়ন্ত্রণ, বৈধ লাইসেন্স ও গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা এবং যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করানো বন্ধে নিয়মিত অভিযান প্রয়োজন।
এদিকে ত্রিশালের বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়ক ও মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে। এসব যানবাহনের অনেকগুলো দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও অন্যান্য ভারী যানবাহনের সঙ্গে একই সড়ক ব্যবহার করে। ফলে যানবাহনের গতির পার্থক্যের কারণে সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে মহাসড়কে দ্রুতগতির বাস বা ট্রাকের সামনে ধীরগতির সিএনজি চলে এলে, হঠাৎ থেমে গেলে কিংবা যাত্রী ওঠানামার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণভাবে রাস্তা পারাপার ও ওভারটেকিংয়ের কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক বাস ও ভারী যানবাহন অতিরিক্ত গতিতে চলাচল করে। একে অপরকে অতিক্রম করার সময় কোনো কোনো চালক বিপজ্জনকভাবে বিপরীত লেনে চলে যান। সামনে থেকে যানবাহন এলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
তবে প্রতিটি দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কোনো দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালক বা একটি নির্দিষ্ট যানবাহনকে দায়ী করার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফল বিবেচনা করা জরুরি।
দুর্ঘটনার পেছনে যানবাহনের ফিটনেস, চালকের দক্ষতা, বৈধ লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তায় চলাচল করছে কি না এবং চালকদের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে কি না এ বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
অন্যদিকে মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে যত্রতত্র সিএনজি, মাহিন্দ্রা, বাসসহ বিভিন্ন যানবাহন দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। এতে যানচলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। পেছন থেকে আসা দ্রুতগতির যানবাহন অনেক সময় দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িকে এড়িয়ে যেতে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে লেন পরিবর্তন করে। এতেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দুর্ঘটনা কমাতে শুধু দুর্ঘটনার পর মামলা বা অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেখানে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ পার্কিং বন্ধ, চালকের লাইসেন্স ও গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বন্ধে নিয়মিত অভিযান প্রয়োজন।
পাশাপাশি মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সড়ক চিহ্ন ও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং যাত্রী ওঠানামার জন্য নির্ধারিত স্থান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসনাত জাহান খান বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করানো এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘মহাসড়কে অবৈধ থ্রি-হুইলার বা অনুমোদনহীন যানবাহন চলাচলের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। কোন ধরনের যানবাহন মহাসড়কে চলাচলের অনুমতি রয়েছে এবং কোনগুলো আইনবহির্ভূতভাবে চলাচল করছে, তা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অবৈধ স্ট্যান্ড ও যত্রতত্র পার্কিংয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সড়কে যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এমন অবৈধ স্ট্যান্ড বা পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করা হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত স্থানে যাত্রী ওঠানামা ও যানবাহন রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।’
ত্রিশালে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে পুলিশ পরিদর্শক (শহর ও যানবাহন) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন না মানা, যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা এবং মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের চলাচলকে দেখা হচ্ছে। তবে প্রতিটি দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ আলাদাভাবে তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘মহাসড়কে অবৈধ থ্রি-হুইলার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চালকদের বৈধ লাইসেন্স, যানবাহনের কাগজপত্র ও ফিটনেস পরীক্ষা করা হচ্ছে। আইন অমান্যকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
অবৈধ স্ট্যান্ড ও যত্রতত্র পার্কিংয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সড়কে যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এমন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় যানজট ও অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক সদস্যদের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’
ত্রিশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনসুর আহমেদ বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে শুধু পুলিশের একার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়; চালক, যাত্রী ও পথচারীসহ সবাইকে সচেতন হতে হবে। চালকদের নির্ধারিত গতিসীমা মেনে যানবাহন চালাতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওভারটেকিং থেকে বিরত থাকতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘যেসব এলাকায় মানুষের চলাচল বেশি, সেসব স্থানে নিরাপদ পারাপারের জন্য ফুটওভারব্রিজ বা প্রয়োজনীয় পারাপার ব্যবস্থা তৈরি করা এবং তা ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করা জরুরি। অনেক সময় পথচারীরা নির্ধারিত পারাপারের ব্যবস্থা ব্যবহার না করে ঝুঁকি নিয়ে মহাসড়ক পার হন, এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়।’
