নীলফামারীর ডিমলায় তিস্তা ব্যারেজসংলগ্ন ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সিল্টট্রাপ থেকে উত্তোলন করা বালু সরকারি নিলামে বিক্রির পর তা সরিয়ে নিতে গিয়ে তিস্তার তীর ঘেঁষে তৈরি হয়েছে গভীর খাদ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিলামে বিক্রি করা এসব বালু অপসারণের সময় নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে সমতল জমি কেটে মাটি-বালু তোলা হয়েছে। এতে কোথাও কোথাও ৮-১০ ফুট গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। পরে এসব গর্তে পানি জমে বড় বড় পুকুর ও জলাধারের মতো সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, তিস্তার পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে কিংবা বড় ধরনের বন্যা হলে নদীর তীরের এসব গভীর খাদ ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এতে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে নতুন চ্যানেল সৃষ্টি হলে খালিশা চাপানি ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথ তুহিন বাঁধ, বাইশপুকুর গ্রামসহ আশপাশের এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে নতুন পথে পানি প্রবাহিত হলে ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের ভেন্ডাবাড়িসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার আবাদি জমি ও বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়, মুজিব কেল্লা ও আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরবাড়িও ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন তারা।
জানা গেছে, সিল্টট্রাপে জমে থাকা পলি-বালু স্থানীয় ড্রেজার মেশিনের মাধ্যমে উত্তোলন করে তিস্তা নদীর পাশে সিল্টট্রাপসংলগ্ন এলাকায় স্তূপ করে রাখা হয়। পরে সরকারি নিলামে এসব বালু বিক্রি করা হলে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে বালু কেনেন মো. জয়নাল আবেদীন।
নিলামে কেনা বালু অপসারণের সময় নির্ধারিত এলাকার বাইরে গিয়ে মাটি কেটে অতিরিক্ত মাটি-বালু তুলে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
নিলাম সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, সিল্টট্রাপের দক্ষিণ পাশে প্রধান খালসংলগ্ন অংশে ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৯১ দশমিক ৬২ ঘনফুট এবং তিস্তা নদীসংলগ্ন অংশে ৬ লাখ ৯৫ হাজার ৫৭০ দশমিক ৩ ঘনফুট বালু নিলামে তুলে বিক্রি করা হয়। দুই লটে মোট বালুর পরিমাণ ১১ লাখ ৩০ হাজার ৬৬১ দশমিক ৯২ ঘনফুট।
নিলামের শর্তে নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে বালু সংগ্রহ না করা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বালু অপসারণ, পরিবহনের সময় বালু ঢেকে নেওয়া এবং রাতে বালু পরিবহন না করার কথা রয়েছে। পাশাপাশি সড়ক, বাঁধ, সেতু, কালভার্টসহ সরকারি-বেসরকারি কোনো স্থাপনার ক্ষতি না করার শর্তও রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, বালু পরিবহনে ১০ চাকার ডাম্প ট্রাক ব্যবহার করা হয়েছে। দিন-রাত এসব ট্রাক চলাচলের কারণে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিদর্শন সড়কের বিভিন্ন স্থানে গর্ত ও ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। বালু অপসারণের সময় সরকারি গাছও উপড়ে ফেলা হয়েছে।
বাইশপুকুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জলিল বলেন, ‘তিস্তা নদীর পাড় ঘেঁষে গভীর করে মাটি কাটায় বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। গর্তগুলোতে পানি জমে জলাধারের মতো হয়ে গেছে। তিস্তার পানি বাড়লে এসব জায়গা দিয়ে পানি ঢুকে নদীর তীর ভেঙে যেতে পারে। এতে এ অঞ্চলের যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ‘তুহিন বাঁধ’ ও আশপাশের এলাকা ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
ডালিয়া নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা লুৎফর রহমান বলেন, ‘বালু সরানোর সময় সমতল জায়গা কেটে গভীর গর্ত করা হয়েছে। এতে এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশও বদলে গেছে। পানি জমে থাকা এসব গর্ত শিশু ও গবাদি পশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। যে কোনো সময় বন্যায় এই এলাকা ভেঙে যেতে পারে।’
স্থানীয় বাসিন্দা তমিজ উদ্দিন বলেন, ‘১০ চাকার ডাম্প ট্রাকে দিন-রাত বালু পরিবহন করায় ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিদর্শন সড়কের বিভিন্ন জায়গায় গর্ত ও ফাটল দেখা দিয়েছে। তিস্তার এত কাছে গভীর করে মাটি কাটার বিষয়টিও তদন্ত করা প্রয়োজন।’
এ ঘটনায় স্থানীয়রা গত ২৫ সেপ্টেম্বর ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে নিলামের শর্ত লঙ্ঘন, নির্ধারিত এলাকার বাইরে মাটি কাটা, সড়কের ক্ষতি এবং তিস্তার তীরবর্তী এলাকায় গভীর খাদ সৃষ্টির বিষয় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে নিলাম গ্রহীতা মো. জয়নাল আবেদীনের বক্তব্য জানতে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শনও করা হয়েছে। গভীর খাদ সৃষ্টি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট নিলাম গ্রহীতাকে দ্রুত সেগুলো ভরাট করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নিলাম কমিটির সভাপতি মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। নিলামগ্রহীতা মো. জয়নাল আবেদীন নিলামের শর্ত ভঙ্গ করে থাকলে বিষয়টি যাচাই করে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
