সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে শ্রমিক ও বিভিন্ন জাতিসত্তার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে আয়, মজুরি ও সম্পদের বৈষম্য দূর করা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নারী-পুরুষসহ সব ধরনের বৈষম্যের অবসানের বিষয় সংবিধানে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা।
বিভিন্ন জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি, আদিবাসীদের ভূমির অধিকার এবং জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
রোববার (৪ অক্টোবর) জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অবদান রাখা শ্রমজীবী মানুষ এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের মতবিনিময় সভায় এসব প্রস্তাব ও দাবি উঠে আসে।
মতবিনিময় সভায় সংস্কৃতিকর্মী সঞ্জীব দ্রং বলেন, বর্তমান সংবিধানের ৬-এর ২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি বলে পরিচিত হবে।’ জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী এটি সংশোধন করে ‘বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলে পরিচিত হবে’ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কমিটির পক্ষ থেকে বিষয়টি গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সঞ্জীব দ্রং বলেন, সংবিধানে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ থাকলেও গারো, হাজংসহ বিভিন্ন জাতিসত্তার মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশে রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
বৈঠক সূত্র জানায়, আদিবাসী প্রতিনিধিরা সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে ব্যবহৃত ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’, ‘সম্প্রদায়’ ও ‘উপজাতি’ শব্দগুলো বিলুপ্ত করার দাবি জানান। এর পরিবর্তে তাঁদের ‘আদিবাসী’ অথবা ‘জনজাতি’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। তবে এ প্রস্তাবের বিষয়ে কমিটির পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি বলে মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়া একটি সূত্র দাবি করেছে।
এ ছাড়া ১৯৭২ সালের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রীয়, সমবায় ও ব্যক্তিগত মালিকানার পাশাপাশি আদিবাসীদের প্রথাগত ও সমষ্টিগত ভূমি মালিকানার আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
প্রতিনিধিরা জাতীয় সংসদে আদিবাসী, প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে উচ্চকক্ষে আসন সংরক্ষণের প্রস্তাব দেন। পাহাড় ও সমতলের সব ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জন্য আনুপাতিক হারে আসন বরাদ্দের দাবিও জানানো হয়। পাশাপাশি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি আসন রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
শ্রমিক নেতা রাজেকুজ্জামান রতন গণমাধ্যমকে বলেন, শ্রমিকদের পক্ষ থেকে আমরা কাজ, মজুরি ও মর্যাদাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই চেতনার মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্য থেকে মুক্তি। অথচ শ্রমিকদের আয়, মজুরি ও সম্পদে বৈষম্য রয়েছে। এ বৈষম্য দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ চাই।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাসলিমা আখতার বলেন, উচ্চকক্ষে শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, তথ্য অধিকার, আদালত সংস্কার এবং স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের বিধিবিধান তৈরিতে শ্রমিক প্রতিনিধিদের যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ‘ছাত্র-শ্রমিক-জনতার’ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করার দাবিও জানানো হয়েছে। কারণ, এ আন্দোলনে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ প্রাণ দিয়েছেন।
সূত্র জানায়, কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের দেওয়া প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নিয়ে কমিটি তার সুপারিশ প্রণয়ন করবে।
বৈঠকে কমিটির সদস্য আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান, জুলাই জাতীয় সনদ এবং সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সুপারিশগুলো বিবেচনায় নিয়ে সংসদে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন করা হবে।
সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বৈঠকে উত্থাপিত প্রস্তাব এবং লিখিতভাবে কমিটির কাছে পাঠানো প্রস্তাবগুলো কমিটির প্রস্তুত করা প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, সংবিধান সংশোধন নিয়ে আলোচনার জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, নারী নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি ও সংগঠন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও আইনজীবী, শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের পর্যায়ক্রমে পরবর্তী বৈঠকগুলোতে আমন্ত্রণ জানাবে কমিটি।
কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, কমিটির সদস্য ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, আন্দালিব রহমান, সাকিলা ফারজানা এবং মো. মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন। কমিটির বিশেষ আমন্ত্রণে জাতীয় সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, আন্না মিনজ ও মাধবী মারমা বৈঠকে অংশ নেন।
